ইউভাল নোয়া হারারির লেখা সেপিয়েন্স এই সময়ের খুব গুরুত্বপূর্ণ
একটা বই। বইটি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর বেস্ট সেলার হয়েছে, এখন
পর্যন্ত ৪৫টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, সব
ধরনের মানুষের কাছে প্রবলভাবে আলোচিত হয়েছে। বহুল আলোচিত
বই মানেই কিš‧ বহুল পঠিত বই নয় কিন্তু সেপিয়েন্স-এর বেলায়
নির্দ্বিধায় বলা যায়, এটি একইসঙ্গে বহুল আলোচিত এবং বহুল পঠিত
একটা বই। সত্যি কথা বলতে কি, বইটি এর মধ্যেই একটা
প্রবাদবাক্যের রূপ নিয়েছে। কারণটা খুব সহজ, এটা খুব সহজপাঠ্য
একটা বই। এর মধ্যে ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন কিংবা অর্থনীতি সবই
আছে কিš‧ বইটি পড়ার সময় কেউ জ্ঞানের চাপে ভারাক্রান্ত হয় না।
হারারি বইটিতে নিজের যুক্তিকে প্রমাণ করার জন্য অসংখ্য তথ্য
উপস্থাপন করেছেন, সেই সেই তথ্যগুলো প্রায় সময়ই এত চমকপ্রদ যে
পাঠক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান।
বইটির সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ হচ্ছে প্রচলিত নানা ধ্যানধারণা
নিয়ে লেখকের ব্যাখ্যা। কিছু কিছু ব্যাখ্যা প্রচলিত ব্যাখ্যা থেকে
পুরোপুরি ভিন্ন, সবাই সবকিছু মেনে নিয়েছেন তাও নয় কিš‧ এসব
ব্যাখ্যা সবাইকে যে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে, সেটা কেউ
অস্বীকার করতে পারবে না। আমি নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র, তাই বিজ্ঞানের
সব বিশ্লেষণই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছেÑ তা নয় কিš‧ তাঁর
যুক্তিতর্ক এবং বিশ্লেষণ আমাকে ভাবিত করেছেÑ সেটি অস্বীকার করার
কোনো উপায় নেই।
তবে আমি এই ভ‚মিকায় সেপিয়েন্স বইটি নিয়ে লিখতে বসিনি, আমি
এর অনুবাদ নিয়ে লিখতে বসেছি। যাঁরা জীবনে কখনো কোনো কিছু অনুবাদ
করার চেষ্টা করেছেন তাঁরা সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন, কাজটি
মোটেও সহজ একটি কাজ নয়। সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা
অনুবাদসাহিত্য, পৃথিবীর নানা ভাষায় নানা সাহিত্যের সঙ্গে আমরা পরিচিত
হতে পারি শুধু অনুবাদের কারণে। কাজেই সারা পৃথিবীতেই ভালো
অনুবাদের গুরুত্ব অনেক বেশি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলা সাহিত্যের যদি
যথাযথ অনুবাদ হতো, তাহলে এতদিনে আমাদের একটামাত্র নোবেল
পুরস্কারে সন্তুষ্ট থাকতে হতো না। আমি নিশ্চিত, শুধু ভালো অনুবাদ নেই
বলে নানা ভাষার অনেক মহৎ সাহিত্য পৃথিবীতে অজানা থেকে গেছে।
কাজেই যখন দেখেছি সুফিয়ান লতিফ, শুভ্র সরকার ও রাগিব আহসান
নামে বুয়েটের তিনজন প্রাক্তন ছাত্র মিলে সেপিয়েন্স বইটি অনুবাদ করেছে,
আমি অনেক আনন্দ পেয়েছি। যখন বইয়ের পাণ্ডলিপিটি দেখার সুযোগ
পেয়েছি, আমার আনন্দ শতগুণ বেড়ে গিয়েছে; কারণ তখন আবিস্কার
করেছি এটা মোটেও দায়সারা একটি অনুবাদ নয়। মূল বইয়ের মতোই এই
অনুবাদটি সহজ, সরল ও স্বচ্ছন্দ। শুধু অনুবাদ স্বচ্ছন্দ নয় বলে অনেক
গুরুত্বপূর্ণ লেখা শেষ পর্যন্ত অপঠিত থেকে যায়।
সেপিয়েন্স বইটির চমৎকার এই অনুবাদটি দেখে আমি যেটুকু
আনন্দ পেয়েছি তার থেকেও বেশি আনন্দ পেয়েছি এই অনুবাদকর্মের
পেছনের ইতিহাসটি জেনে। অনুবাদক তিনজন হারারির কাজকর্ম দেখে
এবং শেষ পর্যন্ত বইটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এটি অনুবাদ
করে দেশের মানুষ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেবে। এর
পেছনে বিন্দুমাত্র বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য একটিই, নতুন
প্রজন্ম যেন প্রচলিত ধ্যানধারণাকে নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে
শেখে। অনুবাদের কাজটি শেষ করতে তাদের দুই বছর সময় লেগেছে,
এর মধ্যে আরো একটি অনুবাদ বের হয়ে গেছে, তবু তারা নিজেদের
কাজে নিরুৎসাহিত হয়নি। ভালো কাজ একের অধিক হলেও ক্ষতি
নেই। অনুবাদ শেষ হওয়ার পর তারা মোস্তাক আহমেদকে দিয়ে তিনতিনবার সম্পাদনা করিয়েছে, আমাদের দেশের প্রকাশনাশিল্পের জন্য
যেটি একটি মাইলফলক। এই দেশে সরাসরি বই লেখা হয়, কখনো
সেটি যত্ন করে সম্পাদনা করা হয় না! ২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি
তারা বইটিকে পাঠকদের জন্য ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করে দেয়। খুবই
সংগত কারণে সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ, পশ্চিম বাংলা এবং পৃথিবীর নানা
জায়গার বাঙালিরা সেটা পড়তে শুরু করে দেয়। বইটির এই অভ‚তপূর্ব
জনপ্রিয়তা দেখে তাদের মনে হয়েছে, এটাকে এখন কাগজে মুদ্রিত বই
হিসেবেও বের করা যেতে পারে। আমার ধারণা, প্রত্যেকটি বই-ই
এভাবে লেখা উচিত, যদি দেখা যায় নেটে একটি বইকে পাঠকেরা গ্রহণ
করেছে, শুধু তাহলেই সেটা কাগজের বই হিসেবে ছাপানো যায়।
(হাজার হলেও এক টুকরো কাগজের অর্থ পৃথিবীর কোথাও না কোথাও
একটা গাছের মৃত্যু!)
আমি অবশ্যই এই বইটির সাফল্য কামনা করি। আমি চাই নতুন
প্রজন্ম বইটি পড়ুক, বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে চিন্তা করুক, একে অন্যের
সঙ্গে আলোচনা করুক। সারা পৃথিবীতে তরুণ প্রজন্মকে সোশাল
নেটওয়ার্ক নামক মাদক দিয়ে যে স্বল্পবুদ্ধি তরল পদার্থে পরিণত করার
ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে, তারা সেই ষড়যন্ত্র থেকে বের হয়ে আসুক। আমি
চাই অন্য তরুণেরা এই চমৎকার কাজটি দেখে অনুপ্রাণিত হোক,
তারাও এই তিনজন উৎসাহী তরুণের মতো চমৎকার অন্য একটি বই
অনুবাদ করুক।
আমি সুফিয়ান লতিফ, শুভ্র সরকার ও রাগিব আহসানকে তাদের
এই চমৎকার কাজের জন্য অভিনন্দন জানাই। আমি এখন আগ্রহ নিয়ে
অপেক্ষা করে থাকব দেখার জন্য, তারা এরপর আমাদের নতুন কী
উপহার দেয়!
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
২৬.৫.২০১৮