একবার দুর্গাপূজার সময় নেত্রকোণা ভ্রমণে ছিলাম। মণ্ডপে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার আমাদের সঙ্গে চা-পানে বসলেন। তার চেহারায় বিরক্তি। বললেন, অনেক মুসলমান অবাধে মন্দিরে ঢুকে নাচ ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে, রং মাখামাখি করছে, নারীদের সঙ্গে পরিহাস করছে। মাদরাসা-পড়ুয়া এক ছাত্র এল। পাঞ্জাবিটা খুলে নিরাপদে রাখল। আমি তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। সে এদিক-ওদিক এক পলক দেখে নিয়ে সুড়সুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল এবং পূজারিনিদের সঙ্গে উদোম নাচে মেতে উঠল। টানা নাচতে নাচতে প্রায় ঘুরে পড়ার দশা হলে ক্ষেন্ত দিলো এবং তাকে উদ্ধার করে এনে শুশ্রূষাও করতে হলো! হ্যাঁ, এটাই ‘কোনো লোক ভোরে উঠবে ঈমানদার হয়ে, সন্ধ্যা অতিবাহিত করবে কুফরি অবস্থায়; অথবা সন্ধ্যা কাটাবে মুমিন হিসেবে, ভোরে উপনীত হবে কাফির অবস্থায়।’
সম্প্রতি আমার মা জিগ্যেস করলেন, কেউ যদি বলে, ‘ইয়া আলি নাবিয়্যাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, তা হলে কী হবে? আমি বললাম, তার ঈমান থাকবে না। আলি নবী না, যতই মর্যাদাবান হোন, তিনি সাহাবি। মক্কার কুরাইশ আল্লাহকে বিশ্বাস করত, আল্লাহর নামে কসম করত, তবু তারা মুসলিম নয়; কারণ, তারা নবীজিকে মানত না। যারা ‘ইয়া আলি নাবিয়্যাল্লাহ’ বলে, তারা আলিকে নবী ঘোষণা দেবার অপরাধে সরাসরি ঈমানহারা হয়ে যাবে।
এবার আমি মাকে জিগ্যেস করলাম, হঠাৎ এটা জিগ্যেস করছেন কেন?
মা বললেন, আমাদের প্রতিবেশী এক বাড়িতে একজন বৃদ্ধা মূমুর্ষু অবস্থায় আছেন। মা অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাবার সুন্নাত পালনে তাদের বাড়ি গেলেন। গ্রামের বাড়িগুলোতে সাধারণত মহিলারা ধর্মীয় বিষয়ে কেউ ডাকলে পাশে এসে বসে। মা গিয়ে দেখলেন, সেখানে মহিলারা নামায পড়ে যিকির করছে। যিকিরের অংশ হিসেবে সুর করে করে বলছে, ‘ইয়া আলি নাবিয়্যাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। মা তাদের ধরলেন, এই যিকিরে তো ঈমান থাকবে না। মহিলারা অপারগতা প্রকাশ করল। মা জিগ্যেস করলেন, তারা কোত্থেকে এটা শিখেছে? উত্তর এল, পাশের গ্রাম থেকে কিছু মহিলা তালিম নিয়ে এসেছে। এই মহিলারা সেই তালিমে বসেছে এবং তাদের থেকে এই যিকির শিখেছে।
দেখুন, এই মহিলারা জানেও না এ যিকির তাদের ঈমান হরণ করে ছেড়েছে। আল্লাহর যিকির করছে, বন্দেগিতে নিয়োজিত রয়েছে, এই আনন্দ ধারণাটি তাদের মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেল। এটাই ‘কোনো লোক ভোরে উঠবে ঈমানদার হয়ে, সন্ধ্যা অতিবাহিত করবে কুফরি অবস্থায়; অথবা সন্ধ্যা কাটাবে মুমিন হিসেবে, ভোরে উপনীত হবে কাফির অবস্থায়।’
.
বই : মহিমান্বিত মৃত্যু (প্রকাশিতব্য)
লেখক : ওমর আলী আশরাফ