বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস ও জনপদ সমন্ধে আমাদের সকলেরই জানা উচিত, নিজে পড়ার সুবাদে রেকর্ড করে রাখার ইচ্ছে জাগলো,
প্রাচীন ভারতবাসিগণ সাহিত্যের নানা বিভাগে বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন, কিন্তু নিজেদের দেশের অতীত কাহিনী লিপিবদ্ধ করিবার জন্য তাঁহাদের কোন আগ্রহ বা উৎসাহ ছিল না। পণ্ডিতপ্রবর কহাণ 'রাজতরঙ্গিণী' নামক গ্রন্থে কাশ্মীরের ধারাবাহিক ইতিহাস রচনা করিয়াছেন। কিন্তু এই শ্রেণীর আর কোন গ্রন্থ অদ্যাবধি ভারতবর্ষে আবিষ্কৃত হয় নাই। ইহার ফলে ভারতের প্রাচীন যুগের ইতিহাস একরকম বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ ভারতের প্রাচীন লিপি, মুদ্রা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করিয়া হিন্দুযুগের ইতিহাস উদ্ধারের সূচনা করেন। কালক্রমে অনেক ভারতবাসীও তাঁহাদের প্রবর্তিত পথে অনুসন্ধানকার্যে অগ্রসর হইয়াছেন। ইহাদের সমবেত চেষ্টার ফলে যে সমুদয় তথ্য আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহাতে প্রাচীন যুগের ইতিহাসের কাঠামো রচনা করা সম্ভবপর হইয়াছে।
বাংলা দেশের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতা যে কতদূর গভীর ছিল, ১৮০৮ খ্রীষ্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের অধ্যাপক পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় শর্মা রচিত 'রাজতরঙ্গ' অথবা 'রাজাবলী' গ্রন্থই তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। বাংলার প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে বাঙালী জাতির স্মৃতি ও জনশ্রুতি যে কতদূর বিকৃত হইয়াছিল, এবং পাঁচ ছয় শত বৎসরের মধ্যে বাঙালী জাতির ঐতিহাসিক সূত্র কিরূপে সমূলে ছিন্ন হইয়া গিয়াছিল, এই গ্রন্থখানি পড়িলেই তাহা বেশ বুঝা যায়।
পরবর্তী একশত বৎসর পুরাতত্ত্ব আলোচনার ফলে বাংলার প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান যে কতদূর অগ্রসর হইয়াছিল, রমাপ্রসাদ চন্দ্র-প্রণীত 'গৌড়- রাজমালা' গ্রন্থখানি তাহার প্রমাণ-স্বরূপ গ্রহণ করা যাইতে পারে। এদেশের অনেকে-বিশেষত প্রাচীনপন্থিগণ-পুরাতত্ত্বকে 'পাথরে প্রমাণ' বলিয়া উপহাস অথবা অবজ্ঞা করিয়া থাকেন। কিন্তু প্রাচীন ইতিহাসের উদ্ধারে ইহার মূল্য যে কত বেশী, 'রাজাবলী'র সহিত 'গৌড়রাজমালা'র তুলনা করিলেই তাহা বুঝা যাইবে।
'গৌড়রাজমালা' আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত প্রণালীতে লিখিত বাংলার প্রথম ইতিহাস। ১৩১৯ সনে ইহা প্রকাশিত হয়। ইহার প্রকাশের দুই বৎসর পরে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত 'বাঙ্গালার ইতিহাস' প্রকাশিত হয়। নামে 'বাঙ্গালার ইতিহাস' হইলেও ইহা প্রকৃতপক্ষে বাংলা ও মগধের ইতিহাস।
উল্লিখিত দুইখানি গ্রন্থেই কেবলমাত্র রাজনৈতিক ইতিহাস আলোচিত হইয়াছে। বাংলার একখানি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লিখিবার কল্পনা অনেকবার হইয়াছে। ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল ইহার সূত্রপাত করেন, এবং পরবর্তী ত্রিশ বৎসর আরও দুই একজন এইরূপে চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহা ফলবতী হয় নাই। দীনেশচন্দ্র সেন এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য 'বৃহৎ বঙ্গ' নামে দুই খণ্ডে সম্পূর্ণ একখানি বৃহৎ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন (১৩৪১ সন)। কিন্তু অনেক মূল্যবান তথ্য থাকিলেও, এই গ্রন্থ বাংলার ঐতিহাসিক বিবরণ হিসাবে বিদ্বজ্জনের নিকট সমাদর লাভ করে নাই।
ঢাকা কিববিদ্যালয় হইতেই সর্ব প্রথম বাংলার একখানি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস প্রকাশিত হয়। আমার সম্পাদনায় তিন বৎসর হইল ইহার প্রথম খণ্ড বাহির হইয়াছে। ইহাতে হিন্দযুগের শেষ পর্যন্ত বাংলার ইতিহাস আলোচিত হইয়াছে।
এই গ্রন্থ ইংরেজীতে লিখিত। যখন ইহার প্রথম পরিকল্পনা হয়, তখন আমার
ইচ্ছা ছিল যে, ইংরেজী গ্রন্থ বাহির হইবার পরই ইহার একখানি বাংলা অনুবাদ
প্রকাশের ব্যবস্থা যেন করা হয়। কিন্তু এই গ্রন্থ রচনায় বহ, বিলম্ব হওয়ার ফলে,
ইহার প্রকাশের পূর্বেই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে অবসর গ্রহণ করি। বিশ্ব-
বিদ্যালয়ের বর্তমান কর্তৃপক্ষ যে সত্বর ইহার বঙ্গানুবাদের কোন ব্যবস্থা করিবেন, তাহার কোন সম্ভাবনা দেখা যাইতেছে না। সুতরাং বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস এবং বাঙালীর ধর্ম', শিল্প ও জীবনযাত্রার অন্যান্য বিভাগের মোটামুটি বিবরণ সংবলিত একখানি ক্ষুদ্র গ্রন্থের বিশেষ প্রয়োজন অনুভব করিয়া এই ইতিহাস লিখিতে প্রবৃত্ত হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে প্রকাশিত বাংলার ইতিহাস যে এই গ্রন্থের আদর্শ ও প্রধান উপাদান, তাহা বলাই বাহুল্য।
এই গ্রন্থ সাধারণ বাঙালী পাঠকের জন্য, সূতবাং ইহাতে যুক্তি-তর্কদ্বারা ভিন্ন ভিন্ন মতের নিরসন ও প্রমাণপঞ্জী-যুক্ত পাদটীকা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করিয়াছি। যাঁহারা এই সমুদয় জানিতে চাহেন, তাঁহারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে প্রকাশিত ইংরেজী গ্রন্থখানি পাঠ করিতে পারেন। ইংরেজী ভাষায় অনভিজ্ঞ পাঠকের পক্ষে এই সমুদয় অনাবশ্যক, কারণ এ সম্বন্ধে প্রবন্ধ ও গ্রন্থগুলি প্রায় সবই ইংরেজী ভাষায় লিখিত।
হিন্দুযুগের বাংলা দেশ সম্বন্ধে যে সমুদয় তথ্য এ যাবৎ আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহারই সারমর্ম সংক্ষিপ্ত আকারে বাঙালী পাঠকের নিকট উপস্থিত করিতেছি। যাঁহারা ইংরেজী ইতিহাসখানি পাঠ করিয়াছেন বা করিবেন, তাঁহাদের পক্ষে এই গ্রন্থ সম্পূর্ণ অনাবশ্যক। কিন্তু যাঁহাদের ঐ গ্রন্থপাঠের সুযোগ, সুবিধা অথবা সময় নাই, তাঁহারা ইহা পাঠ করিলে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস সম্বন্ধে কতকটা ধারণা করিতে পারিবেন। অবশ্য এই ইতিহাসের অতি সামান্যই আমরা জানি। কিন্তু এই গ্রন্থপাঠে যদি বাঙালীর মনে দেশের প্রাচীন গৌরব সম্বন্ধে ক্ষীণ ধারণাও জন্মে এবং বাঙালী জাতির অতীত ইতিহাস জানিবার জন্য কৌতূহল ও আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, তাহা হইলেই আমার শ্রম সার্থক মনে করিব।
শ্রীরমেশচন্দ্র মজুমদার
৪নং বিপিন পাল রোড,
কলিকাতা-২৬
পৌষ, ১৩৫২
#বাংলাদেশের_ইতিহাস
#বাংলা
#অডিওবুক
#বাংলার_প্রাচীন_ইতিহাস
#historyofbengal
#bangladesh_documentary