বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস, পাল সাম্রাজ্যের পতন (বাংলাদেশের ইতিহাস, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার)

Description

পাল সাম্রাজ্যের পতন

১। দেবপালের পরবর্তী পালরাজগণ

দেবপালের মৃত্যুর পর তিনশত বৎসর পর্যন্ত পালরাজবংশের ইতিহাস কবিবর্ণিত "পতন-অভ্যুদয়-বন্ধর পন্থায়” অগ্রসর হইয়াছিল। উত্থান-পতনের মধ্য দিয়া চারিশত বৎসরকাল অতিবাহিত করিয়া অবশেষে এই প্রসদ্ধি রাজ্য ও রাজ- বংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ইহাই কালের স্বাভাবিক গতি। বরং এত সুদীর্ঘকালব্যাপী রাজত্বের দৃষ্টান্ত আর্যাবর্তের ইতিহাসে অতি বিরল, নাই বলিলেই চলে।

প্রচলিত ধারণা এই যে, দেবপালের মৃত্যুর পর বিগ্রহপাল সিংহাসনে আরোহণ করেন। দেবপাল ও বিগ্রহপালের সম্বন্ধ লইয়া পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ আছে। কাহারও মতে বিগ্রহপাল দেবপালের পুত্র। কিন্তু অধিকাংশ পণ্ডিতই মনে করেন যে, বিগ্রহপাল ধর্মপালের ভ্রাতা বাপালের পৌত্র ও জয়পালের পুত্র। এই মতই সমীচীন বলিয়া বোধ হয়। বিগ্রহপালের পুত্র নারায়ণপালের তাম্রশাসনে পাল- রাজগণের যে বংশাবলী বিবৃত হইয়াছে, তাহাও এই মতের সমর্থন করে। ইহাতে তৃতীয় শ্লোকে ধর্মপালের বর্ণনার পরে চতুর্থ শ্লোকে তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা বাক্- পালের এবং পঞ্চম শ্লোকে তাঁহার পুত্র জয়পালের উল্লেখ আছে। এই শ্লোকে কথিত হইয়াছে যে, জয়পাল ধর্মদ্বেষীগণকে যুদ্ধে বশীভূত করিয়া পূর্বজ দেবপালকে ভুবনরাজ্যসুখের অধিকারী করিয়া দিয়াছিলেন। পরবর্তী ষষ্ঠ শ্লোকে জয়পাল কর্তৃক উৎকল ও কামরূপ জয় বর্ণিত হইয়াছে। সপ্তম শ্লোকে বলা হইয়াছে, "তাঁহার অজাতশত্রুর ন্যায় বিগ্রহপাল নামক পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।" সংস্কৃত রচনারীতি অনুসারে 'তাঁহার' এই সর্বনাম পদ নিকটবর্তী বিশেষ্যপদকেই সূচিত করে। সুতরাং পঞ্চম ও সপ্তম শ্লোকের 'তাঁহার' এই সর্বনাম পদ যথাক্রমে বাপাল ও জয়পাল সম্বন্ধে প্রযুক্ত হইয়াছে, ইহাই সঙ্গত বলিয়া মনে হয়। অতএব বা পালের পুত্রই যে জয়পাল, এবং জয়পালের পুত্রই বিগ্রহপাল, উক্ত দুইটি শ্লোক হইতে এইরূপই সিদ্ধান্ত হয়। অপর পক্ষ বলেন যে, দেবপাল জয়পালের পূর্বজ বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন, সুতরাং জয়পাল দেবপালের কনিষ্ঠ সহোদর অর্থাৎ ধর্মপালের পুত্র। অতএব পঞ্চম ও সপ্তম শ্লোকের 'তাঁহার' এই সর্বনাম যথাক্রমে ধর্মপাল ও দেবপালের সম্বন্ধেই প্রযোজ্য। এই যুক্তি সঙ্গত বলিয়া মনে হয় না, কারণ পূর্বজ শব্দে কেবল জ্যেষ্ঠ বুঝায়, সহোদর অর্থ গ্রহণ করিতে হইবে, এমন কোন কথা নাই। অপর পক্ষে ইহাও বিবেচ্য যে, ধর্মপাল বা দেবপালের তাম্রশাসনে বাক্পালের বা জয়পালের কোনও উল্লেখ নাই, সহসা নারায়ণপালের তাম্রশাসনে তাঁহাদের এই গুণ-ব্যাখ্যানের হেতু কি? ইহার একমাত্র সঙ্গত কারণ এই মনে হয় যে, বিগ্রহপাল ও তাঁহার বংশধরগণ দেবপালের ন্যায়সঙ্গত উত্তরা- ধিকারী ছিলেন না, সুতরাং তাঁহাদের পূর্বপুরুষগণের কৃতিত্ব দ্বারাই তাঁহাদের সিংহাসন অধিকারের সমর্থন করার প্রয়োজন ছিল। অন্যথা তিন পুরুষ পরে এই

প্রাচীন কীর্তিগাথা উদ্ধারের আর কোন যুক্তি পাওয়া যায় না। দেবপালের কোন পুত্র না থাকায় বিগ্রহপাল পিতৃব্যের সিংহাসন অধিকার করিয়াছিলেন, ইহা সম্ভব বলিয়া মনে হয় না;

Details

464 Views
পাল সাম্রাজ্যের পতন

১। দেবপালের পরবর্তী পালরাজগণ

দেবপালের মৃত্যুর পর তিনশত বৎসর পর্যন্ত পালরাজবংশের ইতিহাস কবিবর্ণিত "পতন-অভ্যুদয়-বন্ধর পন্থায়” অগ্রসর হইয়াছিল। উত্থান-পতনের মধ্য দিয়া চারিশত বৎসরকাল অতিবাহিত করিয়া অবশেষে এই প্রসদ্ধি রাজ্য ও রাজ- বংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ইহাই কালের স্বাভাবিক গতি। বরং এত সুদীর্ঘকালব্যাপী রাজত্বের দৃষ্টান্ত আর্যাবর্তের ইতিহাসে অতি বিরল, নাই বলিলেই চলে।

প্রচলিত ধারণা এই যে, দেবপালের মৃত্যুর পর বিগ্রহপাল সিংহাসনে আরোহণ করেন। দেবপাল ও বিগ্রহপালের সম্বন্ধ লইয়া পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ আছে। কাহারও মতে বিগ্রহপাল দেবপালের পুত্র। কিন্তু অধিকাংশ পণ্ডিতই মনে করেন যে, বিগ্রহপাল ধর্মপালের ভ্রাতা বাপালের পৌত্র ও জয়পালের পুত্র। এই মতই সমীচীন বলিয়া বোধ হয়। বিগ্রহপালের পুত্র নারায়ণপালের তাম্রশাসনে পাল- রাজগণের যে বংশাবলী বিবৃত হইয়াছে, তাহাও এই মতের সমর্থন করে। ইহাতে তৃতীয় শ্লোকে ধর্মপালের বর্ণনার পরে চতুর্থ শ্লোকে তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা বাক্- পালের এবং পঞ্চম শ্লোকে তাঁহার পুত্র জয়পালের উল্লেখ আছে। এই শ্লোকে কথিত হইয়াছে যে, জয়পাল ধর্মদ্বেষীগণকে যুদ্ধে বশীভূত করিয়া পূর্বজ দেবপালকে ভুবনরাজ্যসুখের অধিকারী করিয়া দিয়াছিলেন। পরবর্তী ষষ্ঠ শ্লোকে জয়পাল কর্তৃক উৎকল ও কামরূপ জয় বর্ণিত হইয়াছে। সপ্তম শ্লোকে বলা হইয়াছে, "তাঁহার অজাতশত্রুর ন্যায় বিগ্রহপাল নামক পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।" সংস্কৃত রচনারীতি অনুসারে 'তাঁহার' এই সর্বনাম পদ নিকটবর্তী বিশেষ্যপদকেই সূচিত করে। সুতরাং পঞ্চম ও সপ্তম শ্লোকের 'তাঁহার' এই সর্বনাম পদ যথাক্রমে বাপাল ও জয়পাল সম্বন্ধে প্রযুক্ত হইয়াছে, ইহাই সঙ্গত বলিয়া মনে হয়। অতএব বা পালের পুত্রই যে জয়পাল, এবং জয়পালের পুত্রই বিগ্রহপাল, উক্ত দুইটি শ্লোক হইতে এইরূপই সিদ্ধান্ত হয়। অপর পক্ষ বলেন যে, দেবপাল জয়পালের পূর্বজ বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন, সুতরাং জয়পাল দেবপালের কনিষ্ঠ সহোদর অর্থাৎ ধর্মপালের পুত্র। অতএব পঞ্চম ও সপ্তম শ্লোকের 'তাঁহার' এই সর্বনাম যথাক্রমে ধর্মপাল ও দেবপালের সম্বন্ধেই প্রযোজ্য। এই যুক্তি সঙ্গত বলিয়া মনে হয় না, কারণ পূর্বজ শব্দে কেবল জ্যেষ্ঠ বুঝায়, সহোদর অর্থ গ্রহণ করিতে হইবে, এমন কোন কথা নাই। অপর পক্ষে ইহাও বিবেচ্য যে, ধর্মপাল বা দেবপালের তাম্রশাসনে বাক্পালের বা জয়পালের কোনও উল্লেখ নাই, সহসা নারায়ণপালের তাম্রশাসনে তাঁহাদের এই গুণ-ব্যাখ্যানের হেতু কি? ইহার একমাত্র সঙ্গত কারণ এই মনে হয় যে, বিগ্রহপাল ও তাঁহার বংশধরগণ দেবপালের ন্যায়সঙ্গত উত্তরা- ধিকারী ছিলেন না, সুতরাং তাঁহাদের পূর্বপুরুষগণের কৃতিত্ব দ্বারাই তাঁহাদের সিংহাসন অধিকারের সমর্থন করার প্রয়োজন ছিল। অন্যথা তিন পুরুষ পরে এই

প্রাচীন কীর্তিগাথা উদ্ধারের আর কোন যুক্তি পাওয়া যায় না। দেবপালের কোন পুত্র না থাকায় বিগ্রহপাল পিতৃব্যের সিংহাসন অধিকার করিয়াছিলেন, ইহা সম্ভব বলিয়া মনে হয় না;

Related Audio Books

বাংলা দেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ ভূমিকা ও প্রকাশকের কথা। ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার রচিত।
বাংলা দেশের ইতিহাস প্রাচীন যুগ ভূমিকা ও প্রকাশকের কথা। ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার রচিত। (বাংলাদেশের ইতিহাস ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত)
StoryPaths with Antor রমেশচন্দ্র মজুমদার
বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ) ড.রমেশ চন্দ্র মজুমদার রচিত ১ম পর্ব
বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ) ড.রমেশ চন্দ্র মজুমদার রচিত ১ম পর্ব (বাংলাদেশের ইতিহাস ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত)
StoryPaths with Antor রমেশচন্দ্র মজুমদার
বাংলার প্রাচীন জনপদ ও সীমানা,(বাংলাদেশের ইতিহাস, ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার) ২য় পর্ব।
বাংলার প্রাচীন জনপদ ও সীমানা,(বাংলাদেশের ইতিহাস, ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার) ২য় পর্ব। (বাংলাদেশের ইতিহাস ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত)
StoryPaths with Antor রমেশচন্দ্র মজুমদার
বাঙালি জাতির উৎপত্তি (বাংলা দেশের ইতিহাস ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার) ৩য় পর্ব।
বাঙালি জাতির উৎপত্তি (বাংলা দেশের ইতিহাস ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার) ৩য় পর্ব। (বাংলাদেশের ইতিহাস ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত)
StoryPaths with Antor রমেশচন্দ্র মজুমদার
বাংলাদেশের প্রাক আর্যযুগ ও আর্য প্রভাব (বাংলা দেশের ইতিহাস ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার)৪র্থ পর্ব।
বাংলাদেশের প্রাক আর্যযুগ ও আর্য প্রভাব (বাংলা দেশের ইতিহাস ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার)৪র্থ পর্ব। (বাংলাদেশের ইতিহাস ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত)
StoryPaths with Antor রমেশচন্দ্র মজুমদার
বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ( বাংলা দেশের ইতিহাস, ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার পর্ব -৫
বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ( বাংলা দেশের ইতিহাস, ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার পর্ব -৫ (বাংলাদেশের ইতিহাস ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত)
StoryPaths with Antor রমেশচন্দ্র মজুমদার
গুপ্ত শাসন ও গুপ্ত পরবর্তী যুগ (বাংলা দেশের ইতিহাস ড.রমেশ চন্দ্র মজুমদার ৬ষ্ট পর্ব)
গুপ্ত শাসন ও গুপ্ত পরবর্তী যুগ (বাংলা দেশের ইতিহাস ড.রমেশ চন্দ্র মজুমদার ৬ষ্ট পর্ব) (বাংলাদেশের ইতিহাস ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত)
StoryPaths with Antor রমেশচন্দ্র মজুমদার
প্রাচীন পাল সাম্রাজ্য  (বাংলাদেশের ইতিহাস ড. রমেশচন্দ্র  মজুমদার ৮ম পর্ব)
প্রাচীন পাল সাম্রাজ্য (বাংলাদেশের ইতিহাস ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ৮ম পর্ব) (বাংলাদেশের ইতিহাস ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত)
StoryPaths with Antor রমেশচন্দ্র মজুমদার
বাংলার পাল সাম্রাজ্যের পতন,বাংলাদেশের ইতিহাস, ড.রমেশচন্দ্র মজুমদার
বাংলার পাল সাম্রাজ্যের পতন,বাংলাদেশের ইতিহাস, ড.রমেশচন্দ্র মজুমদার (বাংলাদেশের ইতিহাস ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত)
StoryPaths with Antor রমেশচন্দ্র মজুমদার
বাংলাদেশের ইতিহাস,দ্বিতীয় পাল সাম্রাজ্য,ড.রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিতAncient history of bengal #history
বাংলাদেশের ইতিহাস,দ্বিতীয় পাল সাম্রাজ্য,ড.রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিতAncient history of bengal #history (বাংলাদেশের ইতিহাস ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার রচিত)
StoryPaths with Antor রমেশচন্দ্র মজুমদার