স্বপ্ন-ক্রিয়া
যখন আপনারা সাফল্যের সঙ্গে স্বপ্ন-সেন্সর ব্যবস্থা এবং প্রতীক-পুনরুস্থাপন- ব্যবস্থা বুঝতে পারবেন তখনো অবশ্য বলা যাবে না যে স্বপ্ন-বিকৃতিকরণের প্রক্রিয়া আপনারা পুরোপুরি আয়ত্তে আনতে পেরেছেন, তবে এটুকু নিশ্চয়ই বলা যাবে যে আপনারা অধিকাংশ স্বপ্ন বোঝার মতো অবস্থায় এসেছেন। এটা পুরোপুরি করতে গেলে দুটি পরস্পর পরিপুরক পদ্ধতি আপনাদের কাজে লাগাতে হবে: প্রথমে স্বপ্নদর্শী'র অনুষঙ্গগুলিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না বদলি থেকে বদলির পশ্চাৎবতী' মূল চিন্তার কাছে পৌঁছনো যায়, আর তারপুর প্রতীকের অর্থ আপনি সরবরাহ করবেন এ বিষয়ে আপনার সঞ্চিত জ্ঞান থেকে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে কী কী সন্দেহজনক বিষয় আছে সে বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো।
এবার আমরা সেই কাজে ফিরে যাবো যা আমরা আগে আমাদের পর্যাপ্ত সাজসরঞ্জাম না-থাকা সত্ত্বেও সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছিলাম স্বপ্ন-উপাদান এবং তাদের নিচে নিহিত প্রকৃত বা মূল চিন্তার মধ্যবর্তী' সম্পর্ক' অনুধাবন করার ব্যাপারে। তখন আমরা চারটি প্রধান সম্পর্কে'র অস্তিত্ব নির্ধারণ করেছিলাম: ১. সমগ্রের বদলি হিশেবে অংশ, ২. পূর্বসূত্রের ইঙ্গিত (allusions), ৩. প্রতীকী যোগাযোগ, ৪. শব্দ বা ভাষার চিত্রায়ণ (দৃশ্যচিত্র)। এবার আমরা এ বিষয়ে আরো বিশদভাবে আলোচনা করব, সামগ্রিক ব্যক্ত বিষয়বস্তুর সঙ্গে অব্যক্ত স্বপ্ন যা আমাদের ব্যাখ্যায় উন্মোচিত হয়েছে, তাদের একটা তুলনামূলক আলোচনার সাহায্যে।
আমি আশা করি, আপনারা কখনোই আর এই দুটিকে গুলিয়ে ফেলবেন না। যদি আপনারা এদের প্রভেদ ঠিকঠাক ধরতে পারেন তাহলে আপনারা স্বপ্ন বোঝার ব্যাপারে এমনকি সেইসব পাঠকের অধিকাংশের চেয়েও এগিয়ে যেতে পারবেন, যাঁরা আমার গ্রন্থ Interpretation of Dreams পড়েছেন। আবার আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিচ্ছি, যে-প্রক্রিয়ায় অব্যক্ত স্বপ্ন পাল্টে যায় ব্যক্ত স্বপ্নে তাকেই বলা হয় স্বপ্ন-ক্রিয়া (Dream-work) আর ঠিক এর উল্টো প্রক্রিয়া অর্থাৎ যা ব্যক্ত স্বপ্ন থেকে এগিয়ে যায় অব্যক্ত চিন্তার দিকে, তাকে বলা যাঁয় আমাদের ব্যাখ্যা-কর্ম'। তাহলে আমাদের ব্যাখ্যা-কর্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বপ্ন-ক্রিয়াকে ধ্বংস করা। শৈশব-স্বপ্ন ধাঁচের স্বপ্নগুলিতে খোলাখুলি ইচ্ছাপূরণ সহজেই চেনা যায়, কিন্তু সেখানেও দেখা যাবে স্বপ্ন-ক্রিয়া কিছুদূর পর্যন্ত সক্রিয় আছে, কেননা ইচ্ছা সেখানে বাস্তবে পাল্টে গেছে, আবার চিন্তাও পাল্টে গেছে দৃশ্যচিত্রে। এখানে কোনো ব্যাখ্যারই দরকার হচ্ছে না, শুধু আমাদের এই দুটি পরিবর্তন পুনরুদ্ধার করে আনতে হবে। কিন্তু স্বপ্ন- ক্লিয়ার আরো কার্যকলাপ যেখানে চালু আছে-সেই অন্যজাতীয় স্বপ্ন, যাদের মধ্যে স্বপ্ন-বিকৃতিকরণ ঘটেছে তাদের মূল চিন্তাগুলির পুনরুদ্ধার করতে হবে আমাদের ব্যাখ্যার সাহায্যে।
বহু স্বপ্ন-ব্যাখ্যার তুলনামূলক আলোচনার সঙ্গে আমার পরিচয় থাকার কারণে আমি, আপনাদের, তার বিবরণ দিতে পারি, যাতে দেখা যাবে স্বপ্ন-ক্রিয়া কীভাবে অব্যক্ত চিন্তার রসদগুলিকে কাজে লাগায়। কিন্তু অনুগ্রহ ক'রে অতিরিক্ত বুঝে ফেলবেন না, এটি এমন একটি বিবরণ যা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শান্তভাবে শুনতে হবে।
স্বপ্ন-ক্রিয়ার প্রথম কাজ হচ্ছে সংক্ষেপণ (condensation)। এর সাহায্যে আমরা এটা বলার চেষ্টা করছি যে ব্যক্ত-স্বপ্নের বিষয়বস্তু অব্যক্ত চিন্তার চেয়ে কম ধনী বা কম জমকালো অর্থাৎ তা যেন অব্যক্ত চিন্তার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ। কখনো কখনো 'সংক্ষেপণে'র ঘাটতি থাকতে পারে কিন্তু সাধারণত এটির নিয়ম হলো স্বপ্নে উপস্থিত থাকা, এবং প্রায়শই এটি প্রবলমাত্রায় সক্রিয় থাকে। এ কখনোই বিপরীতভাবে কার্যকর হয় না, অর্থাৎ কখনোই এমন হয় না যে ব্যক্ত স্বপ্ন, অব্যক্তের চেয়ে অধিক পরিমাণে ব্যাপ্ত বা বিষয়বস্তুর দিক থেকে অধিক ঐশ্বর্যশালী। সংক্ষেপণ নিম্নলিখিত উপায়ে কার্যকর হয়: ১. কিছু-কিছু অব্যক্ত উপাদান সম্পূর্ণ বাদ যায়; ২. অব্যক্ত স্বপ্নের বহু গুঢ়েষার কেবল একটি ভগ্নাংশমাত্র ব্যক্ত স্বপ্নে প্রবেশাধিকার পায়; ৩. বিভিন্ন অব্যক্ত উপাদান, যারা নিজেদের মধ্যে কোনো সাধারণ বৈশিষ্ট্য ভাগ করে নিতে পারে, তারা ব্যক্ত স্বপ্নে একত্রিত হয়ে মিশ্রিত অবস্থায় একটি একক সমগ্র হিশেবে আবির্ভূত হয়।
যদি আপনারা চান তাহলে অবশ্য 'সংক্ষেপণ' শব্দটি শেষোক্ত প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য সরিয়ে রাখতে পারেন, যা প্রতিক্রিয়ার প্রতিপাদন তুলনামূলকভাবে সোজা। আপনাদের নিজেদের স্বপ্ন লক্ষ করলেই দেখবেন, সহজেই সংক্ষেপণের কিছু দৃষ্টান্ত নজরে পড়ছে যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তি সংক্ষিপ্ত আকার নিয়েছেন একটি ব্যক্তির চেহারায়। এইরকম মিশ্র-ব্যক্তির সঙ্গে দেখা যাবে চেহারায় মিল আছে শ্রীযুক্ত 'ক'-এর, পোশাকে মিল আছে শ্রীযুক্ত 'খ'-এর, পেশায় শ্রীযুক্ত 'গ'- এর, অথচ সবসময় আপনি জানেন ব্যক্তিটি হচ্ছেন প্রকৃতপক্ষে শ্রীযুক্ত 'ঘ'। এই......
#সিগমুন্ড_ফ্রয়েড
#অডিওবুক
#স্বপ্নের_ব্যাখ্যা
#ফ্রয়েডএরবই