ই

ইসলামিক অডিওবুক

June 19, 2026 05:52 AM • 69 views • Original: June 08, 2026 06:35 AM
আফগানিস্তানে 'বাচ্চাবাজি' নিয়ে ববি হাজ্জাজের দাবি কতটা সত্য?
সম্প্রতি একটি পডকাস্টে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ আফগানিস্তানের সামাজিক ব্যবস্থা ও একটি নির্দিষ্ট প্রথা নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন যে, আফগানিস্তানের সরকার ও সমাজ ব্যবস্থাকে অনেকেই উদযাপন করেন, অথচ সেখানে 'বাচ্চাবাজি' নামক একটি প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তিনি দাবি করেন, আফগানিস্তানে গেলে এমন কোনো ট্রাক চালক পাওয়া যাবে না, যে কিনা বাচ্চাবাজ নয়। তার এই মন্তব্যটি ছড়িয়ে পড়ার পর এর ঐতিহাসিক ও বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা যাচাই করে দেখেছে 'বিটুইন দ্য লাইনস ডেস্ক'। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ববি হাজ্জাজের এই দাবি কেবল তথ্যগতভাবেই ভুল নয়, বরং এর আড়ালে থাকা আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বাচ্চাবাজি আসলে কী এবং এর সাথে কারা জড়িত?
বাচ্চাবাজি মূলত একটি প্রাচীন ও চরম নিন্দনীয় প্রথা, যেখানে বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরদের যৌন শোষণ এবং বিনোদনের জন্য দাস হিসেবে ব্যবহার করা হয়।[1] এই হতভাগ্য কিশোরদের সাধারণত নারীদের পোশাক পরিয়ে নাচতে বাধ্য করা হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা পাশবিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।[2] এরা মূলত আসে অত্যন্ত দরিদ্র, ছিন্নমূল বা এতিম পরিবার থেকে। অনেক সময় চরম দারিদ্র্যের কারণে পরিবার টাকার বিনিময়ে তাদের সন্তানদের তুলে দিতে বাধ্য হয়।[3]
তবে ববি হাজ্জাজ দাবি করেছেন যে, আফগানিস্তানের সব ট্রাক চালকই এই প্রথার সাথে যুক্ত, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আন্তর্জাতিক ও দাপ্তরিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাচ্চাবাজি কোনো সাধারণ শ্রমজীবী বা কর্মজীবী মানুষের কাজ নয়। এই জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত থাকে সমাজের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিত্তশালী অংশ। স্থানীয় পুলিশ কমান্ডার, সামরিক বাহিনীর সদস্য, উপজাতীয় নেতা, ওয়ারলর্ড এবং মাফিয়া প্রধানরাই মূলত তাদের ক্ষমতা, প্রতিপত্তি এবং সম্পদের বিকৃত প্রতীক হিসেবে এই কিশোরদের ব্যবহার করে থাকে।[4] সাধারণ ট্রাক চালকদের ওপর এই দায় চাপানো তাই সম্পূর্ণ বাস্তবতাবিবর্জিত।
আফগান ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন এবং তালেবানের কঠোর অবস্থান
বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ আফগানিস্তানকে সমর্থন বা উদযাপন করে সেখানকার কোনো বিকৃত সাংস্কৃতিক প্রথার জন্য নয়, বরং আফগানিস্তান একটি ইসলামী শরিআহ দ্বারা শাসিত রাষ্ট্র বলে। যেকোনো সমাজেই কিছু নেতিবাচক বা নিন্দনীয় প্রথা থাকতে পারে, কিন্তু একটি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিচার করতে হয় সেই রাষ্ট্র তার ভেতরের সামাজিক ব্যাধিগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করছে, তার ওপর ভিত্তি করে। আর ঠিক এই জায়গাতেই ববি হাজ্জাজের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্যতাটি ধরা পড়ে।
বাচ্চাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তালেবান সরকারের জন্য কেবল একটি নীতি ছিল না, বরং তাদের ঐতিহাসিক উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণই ছিল এটি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মুজাহিদীন ওয়ারলর্ডদের দ্বারা সংঘটিত শিশু যৌন নির্যাতন ও বাচ্চাবাজির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই তালেবানদের জন্ম হয়েছিল।[5] ২০০২ সালে 'দ্য টাইমস অব লন্ডন'-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমর দুই মিলিশিয়া কমান্ডারের হাত থেকে এক কিশোরকে ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।[6] এরপর থেকে তারা এমন অসংখ্য কিশোরকে উদ্ধার করে এবং যারা বাচ্চাবাজির সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর মোল্লা ওমর ফতোয়া জারির মাধ্যমে বাচ্চাবাজিকে ইসলামী শরিয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে এর শাস্তি নির্ধারণ করেন মৃত্যুদণ্ড।[7] তালেবানদের এই কঠোর অবস্থানের কারণে সে সময় বাচ্চাবাজি প্রকাশ্যে আসা বন্ধ হয়ে যায় এবং এটি একটি গোপন কার্যক্রমে পরিণত হতে বাধ্য হয়।
মার্কিন দখলদারিত্ব এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও অন্ধকারের অধ্যায়টি শুরু হয় ২০০১ সালে, যখন গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের ধ্বজা উড়িয়ে আমেরিকা আফগানিস্তানে আক্রমণ চালায়। তালেবানদের পতনের সাথে সাথে বাচ্চাবাজির বিরুদ্ধে থাকা শরিয়াহ ভিত্তিক মৃত্যুদণ্ডের আইনটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়।[8] নতুন আফগান আইনে এর কোনো বিকল্প শাস্তির বিধান না থাকায় মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতিতেই বাচ্চাবাজি নতুন করে তার ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।[9] সেক্যুলার পশ্চিমা শক্তি আফগানিস্তানে এই অপরাধ দমনে কোনো পদক্ষেপ তো নেয়ইনি, বরং তারা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক 'লুক দ্য আদার ওয়ে' বা না দেখার ভান করার নীতি গ্রহণ করেছিল।[10]
Back to Archive
Related Posts
Related Books (PDF)