বাল্যকালে ছেলে-মেয়ের আত্ম-ধারণার উপর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়সমূহ
বাল্যকালে বড় ছেলে-মেয়ের সামাজিক জীবনের পরিধি প্রসারিত হলেও ব্যক্তিত্বের উপর পরিবারের প্রভাব কমে না। মা-বাবা, ভাইবোন এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে শিশুর সম্পর্কের প্রকৃতি ও প্রতিপালন পদ্ধতির প্রতি গড়ে ওঠা মনোভাব ইত্যাদি বিষয়গুলো সে কিরকম ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হবে তা নির্ধারণ করে। শৈশবের প্রাথমিক পর্যায়ে জন্মক্রম শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে যতটুকু গুরুত্ব বহন করে বাল্যকালে সে গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ প্রথম সন্তান অথবা পরবর্তী সন্তানের ভূমিকার ভিন্নতার প্রতি তার যে মনোভাব গড়ে উঠেছে তা নিজের প্রতি মনোভাবকে আগে যতটুকু প্রভাবিত করত এ বয়সে তার চেয়ে অনেকবেশি প্রভাব বিস্তার করে। যেমন, প্রথম সন্তান হওয়ার জন্য যে সব বড় ছেলে-মেয়েকে ছোট ভাট-বোনদের দেখাশোনা করতে হয় তারা এ বয়সে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে মনে করে অথবা নিজেকে বিসর্জন দিচ্ছে বলে মনে করে। মা-বাবার আচরণ অনুযায়ী পরিবারের একমাত্র সন্তান ক্রমে তাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে যেতে পারে অথবা যার অনেক ভাইবোন আছে এ রকম ছেলে-মেয়ের চেয়ে বেশি যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বড় ছেলে-মেয়েরা যখন স্কুলে ভর্তি হয় তখন নিজেদের সম্প্রদায় সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত বদ্ধমূল ধারণা (stereotypes) সম্পর্কে এরা অনেক বেশি সচেতন হয়। ফলে ক্রমে যে হীনমন্যতাবোধের সৃষ্টি হয় তা দুর্বল সামাজিক অভিযোজন এবং গহিত আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই রকম প্রবণতা জীবন সম্পর্কে বড় ছেলে-মেয়ের দৃষ্টিভঙ্গীকেও বিঘ্নিত করতে পারে।
পারিবারিক অশান্তি ছোট শিশুদের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার পথে যতটুকু অন্তরায় সৃষ্টি করে বড় ছেলে-মেয়ের বেলায় ততটা করে না।
পারিবারিক সম্পর্কের ফলাফল:
শিশুর জীবনের বিভিন্ন দিকে পারিবারিক সম্পর্কে সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। নীচে সে সম্বন্ধে আলোচনা করা হলো।
প্রথমত, বাল্যকালে পরিবারের সাথে ছেলে-মেয়ের সম্পর্ক তার পড়াশুনা এবং স্কুলের প্রতি মনোভাবের উপর প্রভাব বিস্তার করে। সুখী, সমৃদ্ধ পারিবারিক সম্পর্ক ছেলে-মেয়ের মনে পড়াশোনায় সাফল্য অর্জনের অনুপ্রেরণা জোগায়; অন্যদিকে শিথিল পারিবারিক সম্পর্কের ফলে ছেলে-মেয়ের মধ্যে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়।
মানসিক অস্থিরতার জন্য ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না।
দ্বিতীয়, মা-বাবার সাথে শিশুর সম্পর্ক সামাজিক অভিযোজনকেও প্রভাবান্বিত করে। মা-বাবার সাথে ছেলে-মেয়ের সহজ সম্পর্ক অন্য ব্যক্তির সাথে সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলত সাহায্য করে। কিন্তু এর অভাবে অন্য ব্যক্তির সাথে ছেলে-মেয়েরা সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না।
তৃতীয়ত, গৃহে ছেলে-মেয়ের ভূমিকায় শিশুরা যে আচরণ করতে শেখে বাইরের পরিবেশেও ঠিক সেরকম আচরণ করে। এর ব্যাখ্যাস্বরূপ বলা যায় যে গৃহের আচরণ ধারা এবং ভাই-বোনের সাথে সম্পর্কের প্রকৃতি বাইরের সমবয়সী অন্যান্য ছেলে-মেয়ের সাথে মেলামেশার ভিত্তিস্বরূপ।
চতুর্থত, মা-বাবার লালন-পালন পদ্ধতি এ বয়সে শিশুর ভূমিকা পালনের স্বরূপ নির্ধারণ করে। মা-বাবা প্রভুত্ব ব্যঞ্জক পদ্ধতিতে যখন ছেলে-মেয়েদের প্রতিপালন করেন তখন ছেলে-মেয়ে অনুগত হতে শেখে তবে তারা অসন্তোষের সাথে মা বাবার কথা মেনে চলে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এর বিপরীতে ছেলে-মেয়ের মধ্যে নেতৃত্বের মনোভাব গড়ে তোলে।
পঞ্চমত, গৃহের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা লিঙ্গ-নির্ধারিত ছেলে ও মেয়ের ভূমিকা পালনের সহায়ক। সমাজ-স্বীকৃত লিঙ্গ-নির্ধারিত বদ্ধমূল ধারনা তাদের কেমন হবে এবং কতটুকু সুষ্ঠুভাবে সে ভূমিকা গৃহের বাইরের পরিবেশে পালন করবে তা নির্ভল করে গৃহের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উপর।
ষষ্ঠত, এ বয়সে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জন এবং উচ্চাশার পরিমাণ অনেকাংশে মা-বাবার মনোভাব দ্বারা প্রভাবিত। পরবর্তী সন্তানের তুলনায় প্রথম সন্তান এবং একমাত্র সন্তানের উপর কৃতিত্ব অর্জন করার চাপ বেশি থাকে। মা-বাবার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করার জন্য প্রথম সন্তান সাহায্য পায় বেশি এবং তাদের উৎসাহও বেশি দেওয়া হয়।
সপ্তমত, এ বয়সে ছেলে-মেয়ের উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ অথবা অন্যকে অনুসরণ করার প্রবণতা অনেকাংশে গৃহের প্রশিক্ষণের উপর নির্ভর করে। দেখা গেছে যে গণতান্ত্রিক শিশু প্রশিক্ষণ পদ্ধতি শিশুদের সৃজনশীল হতে উৎসাহিত করে। আর প্রভূত্বব্যঞ্জক পদ্ধতি অন্যকে অনুসরণ (conformist) করতে শেখায়।
#বিকাশমনোবিজ্ঞান