৬.১০ সাধারণ আবেগের রূপ
শৈশবের প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের মধ্যে আবেগের যে যে বৈশিষ্ট্য দেখা যায় বাল্যকালেও তা এক রকম থাকে। তবে দুটি বয়সের আবেগের মধ্যে দুদিক থেকে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত যে পরিস্থিতিতে দুটি বয়সের ছেলে-মেয়ের মধ্যে আবেগের সঞ্চার হবে তাতে পার্থক্য রয়েছে। দ্বিতীয়ত দু'টি বয়সের ছেলে-মেয়ের আবেগ প্রকাশের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন। শুধুমাত্র পরিপক্বতার কারণে যে দুটি বয়সে শিশুদের আবেগময় প্রতিক্রিয়ার মধ্যে এরকম পার্থক্য সূচিত হয় তা নয়। এ রকম পার্থক্যের মূলে রয়েছে অভিজ্ঞতার বিস্তৃতি এবং শিক্ষণ। এ বয়সে চারপাশের সবাই বিভিন্ন ধরনের আবেগের বহিঃপ্রকাশ কি চোখে দেখছে তা একটি শিশু অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বুঝতে পারে। এ বয়সে সবার স্বীকৃতি লাভের উদ্দেশ্যে যে বিশেষ আচরণ সবাই পছন্দ করছে না তা শুধরে নিতে সচেষ্ট হয়। এ বয়সে বালক-বালিকা রাগ সংযত ভাবে প্রকাশ করতে চেষ্টা করে যেমন, মুখ ভার করে থাকা, অভিমান করা ইত্যাদি। চিৎকার হৈ চৈ করে রাগের প্রকাশ (temper outbursts) ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলে তারা বুঝতে শেখে যে ঐরকম আচরণকে সবাই শিশুসদৃশ (childish) আচরণ বলে মনে করে।
সব বালক-বালিকা যেমন এক উপায়ে আবেগ প্রকাশ করে না ঠিক সেভাবেই যেকোনো পরিস্থিতিও তাদের মধ্যে আবেগের সঞ্চার করে না। ছোট শিশুদের সামনে তাদের সম্বন্ধে কেউ অবমাননাকর উক্তি করলে তারা রেগে যায় না। কারণ এর অর্থ তারা বুঝতে পারে না। কিন্তু বাল্যবয়সে ছেলে-মেয়ে অশালীন উক্তির অর্থ ভালভাবে বুঝতে পারে বলে এরকম উক্তি শোনামাত্র শিশু কৌতহল প্রকাশ করে। কিন্তু বালক-বালিকার সামনে নূতন ও অদ্ভুত জিনিসের সব সময় কৌতূহলের সৃষ্টি হয় না। নাম উচ্চারণ
করা হলে তাদের মনে ছোট শিশুর মতো বালক-বালিকাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আবেগ দেখা যায় এবং আবেগ প্রকাশের পদ্ধতিও বিভিন্ন। যে শিশু সবার কাছে প্রিয় নয় তার চেয়ে যে শিশুকে সবাই ভালবাসে সে কম উদ্বিগ্ন হয় এবং অন্যের প্রতি
গবেষকদের মতে বাল্যকালের সব সময়ে মেয়েরা প্রত্যেক বয়সে ছেলেদের চেয়ে বেশি কথা বলে এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের বালক-বালিকার চেয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের বালক বালিকা বেশি কথা বলে। কারণ ছেলেরা বুঝতে পারে কম কথা বলা পুরুষজনোচিত আচরণ। অন্যদিকে নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়ে কথা বলতে ভয় পায় এজন্য যে তাদের নিম্নমানের কথা শুনে সবাই হাসবে।
বাল্যকাল শেষ হয়ে এলে শিশুদের কথা বলার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবে কমে আসে। কথা শুনে সবাই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে পারে ভয়ে যে তারা এ সময় কম কথা বলে তা নয় বরং আসন্ন বয়ঃসন্ধির সাথে সম্বন্ধযুক্ত উদাসীনতার জন্য (withdrawal syndrome) তাদের কথার পরিমাণ কমে যায়। পরবর্তী পরিচ্ছেদে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
৬.৯ বাল্যকালের আবেগের বিকাশ
মেজাজ দেখানো, রাগ করা, উদাসীনতা ইত্যাদি আবেগময় প্রতিক্রিয়া যে সঙ্গী-সাথীর পছন্দ নয় তা এ বয়সের বড় বড় ছেলে-মেয়ে অল্পদিনের মধ্যেই বুঝতে শেখে। ক্রমশ এও বুঝতে শেখে যে রাগে ফেটে পড়াকে বন্ধুরা "ছেলেমী” বলে গণ্য করে। একইভাবে ভয় পেয়ে কোনো পরিস্থিতি থেকে সরে গেলে তা কাপুরুষতার পরিচায়ক এবং ঈর্ষা বশত কারো মনে আঘাত করলে তা অখেলোয়াড়ী মনোভাবের পরিচয় বহন করে। সেজন্য বালক-বালিকা এ বয়সে নিজেদের আবেগ অন্যের সামনে যাতে প্রকাশ না পায় সে বিষয়ে সচেষ্ট হয়।
অবশ্য গৃহে তারা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার তাগিদ অনুভব করে না। সেজন্য প্রায়ই এ বয়সে ছেলেমেয়ে শিশুদের মতো চেঁচামেচি, হৈ চৈ, কান্নাকাটির মাধ্যমে সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। এ রকম পরিস্থিতিতে বয়স অনুযায়ী আচরণ না করার জন্য মা-বাবা ছেলেমেয়েদের কটু কথা বললে অথবা কোনো রকম শাস্তি দিলে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
আনন্দ প্রকাশ করাই হচ্ছে বাল্যকালের আবেগ প্রকাশের বৈশিষ্ট্য। ছেলেমেয়েরা চাপা আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে খিল্বিল্ করে অথবা মন খুলে হাসে; হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করে লাফালাফি করে, এমনকি গড়াগড়িও দিয়ে থাকে। বয়স্ক ব্যক্তির কাছে আবেগের এরকম বহিঃপ্রকাশ শিশুসুলভঅপরিপক্বতা হিসাবে গণ্য হলেও বালক বালিকার প্রতিক্রিয়া দেখলে বোঝা যায় যে, সে যথার্থই সুখী এবং ভালভাবে পরিবারের সাথে অভিযোজন করছে।
#বাল্যকালেআবেগেরগঠন