মনঃসমীক্ষণের এই প্রথম দুঃসাহসী সূত্রটির সঙ্গে তার দ্বিতীয় সূত্রটির (যার কথায় আমি একটু পরেই আসছি) যোগাযোগ কতটা গভীর তা হয়ত আপনারা এখনো অনুমান করতে পারছেন না। মনঃসমীক্ষণের একটি আবিষ্কার হিশেবে আমাদের দ্বিতীয় সূত্রটি হচ্ছে: স্নায়ুরোগ এবং মানসিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে- সংকীর্ণ এবং ব্যাপক এই দু-ই অর্থেই-আমাদের যৌন আবেগের বিশাল বিস্ময়কর ভূমিকা আছে যা আগে কখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। না, শুধু 'তা-ই নয়, তার চেয়েও ঢের বেশি হবে এই যৌন আবেগের অমূল্য অবদান- শিল্প-সংস্কৃতিতে, মানব-মনের সামাজিক বিপুল অগ্রগমনের পেছনে। আমার মতে, মনঃসমীক্ষণিক অনুসন্ধানের এই সিদ্ধান্ত থেকেই তার বিরুদ্ধে যত ঘৃণা। ও আপত্তির সূত্রপাত।
আমরা বিশ্বাস করি, সভ্যতার আবির্ভাব হয়েছে অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রামের তীর চাপের মধ্য থেকে আদিম প্রবৃত্তিগুলির তৃপ্তিসাধন বিসর্জন দিয়ে এবং এই জিনিশ ব্যাপকভাবে ব্যক্তির জীবনেও পুনরায় অনুষ্ঠিত হয়েছে যখন সে সমাজে অংশগ্রহণ করে ও তার প্রবৃত্তিগত সুখ বিসর্জন দেয় সমষ্টিগত মঙ্গলের স্বার্থে'। এইসব প্রবৃত্তিগত শক্তির মধ্যে যৌনশক্তিই প্রধান, যা এইভাবে ব্যবহৃত হয়, কিংবা বলা যাক, যা এইভাবে উত্তরণের পথে এগোয় বা উদ্গতি (Sublimation) লাভ করে অর্থাৎ যৌনশক্তি, তার যৌনলক্ষ্য থেকে স'রে গিয়ে অন্য লক্ষের দিকে ধাবিত হয়, যা যৌন নয়, এবং সামাজিক দিক থেকে আরো মূল্যবান কোনো কিছু। কিন্তু এইভাবে যে-গঠন-কাঠামো নির্মিত হয়, তা খুব দঢ় নয়, কেননা যৌনআবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই কঠিন। প্রতিটি ব্যক্ত, যিনিই সভ্যতা গঠনে অংশগ্রহণ করবেন, তাঁদের প্রত্যেকেরই এই বিপদ আছে যে অবরুদ্ধ যৌনশক্তি, তার লক্ষ্য পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ক'রে বসতে পারে। বাঁধনছাড়া উদ্দাম যৌন আবেগ, তার আদিম লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে চলেছে সমাজ ও তার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে-এর চেয়ে বড় কোনো বাধা। বা শত্রুকে সমাজ, তার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কল্পনাও করতে পারে না। কাজেই সমাজ চায়না তার বিকাশের স্তরে এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়টি কেউ স্পর্শ করুক, চায় না যে যৌনপ্রবৃত্তির শক্তি কতো ভীষণ তা কেউ চিনিয়ে, দিক, অথবা ব্যক্তির যৌনজীবনের তাৎপর্য কেউ উদ্ঘাটিত ক'রে দিক; এটাও যৌনজ তার স্বার্থবিরোধী কাজ। সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বরং এই গোটা ক্ষেত্রটি থেকে সে নজর ঘুরিয়ে দেয়ার পক্ষপাতী। এইজন্যই মনঃসমীক্ষণের সত্যোঘাটন তার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়, বরং সে চাইবে মনঃসমীক্ষণের বক্তব্যকে সৌন্দর্যবোধের দিক থেকে গণ্য করতে কুরুচিকর, নৈতিক দিক থেকে দূষণীয় এমনকি বিপজ্জনক। কিন্তু যেহেতু এই ধরনের আপত্তি সেই ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে খাটে না, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে তা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান দ্বারা প্রাপ্ত বস্তুনিষ্ঠ ফলাফলের উপর দাঁড়িয়ে; অতএব আপত্তিকে ভাষান্তরিত করা হয় বুদ্ধিজীবির ভাষায়, প্রকাশ্যে কিছু বলার আগেই। মানবচরিত্রের একটি ঝোঁক হচ্ছে যা কিছু অপ্রিয় তাকে অসত্য ব'লে ভাবা এবং সহজেই তার বিরুদ্ধে যুক্তি খাড়া করা। কাজেই সমাজ যাকে গ্রহণ করতে পারেনা, তাকেই অসত্য ব'লে ঘোষণা করে, মনঃসমীক্ষণের ফলাফলকে ব্যবহারিক যুক্তি-তর্কে'র সাহায্যে নাকচ করতে চায়, যদিও ঐসব যুক্তির মূলে আছে আবেগ। ঐ আবেগকেই প্রাণপণ শক্তিতে কুসংস্কারের মতো আঁকড়ে ধ'রে থেকে সমাজ, তার বিরোধী মতামতকে অগ্রাহ্য করতে চায়।
উল্টোদিকে, আমরা আপত্তিজনক তত্ত তৈরি করার কোনো ঝোঁকের কাছেই নতি স্বীকার করিনি। আমাদের উদ্দেশ্য, কেবল কয়েকটি ঘটনার সত্যতা স্বীকার ক'রে নেয়া, যা আমরা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য গবেষণার পর আবিষ্কার করেছি। এবার আমরা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ভেতর, তার প্রযুক্তিগত বা ব্যবহারিক দিকের বিবেচনা ঢুকিয়ে দেয়ার কাজটিকে বিনাশর্তে প্রত্যাখ্যান করার অধিকার দাবি করছি এমনকি ঐ ভীত সন্ত্রস্ত 'বিবেচনা' আমাদের ওপর বলপ্রয়েগে ক'রে চাপিয়ে দেয়া আদৌ যুক্তিসংগত কি না সে-বিচার করার আগেই।
এগুলিই হচ্ছে সেইসব প্রারম্ভিক অসুবিধে যা আপনাদের ভোগ করতে হবে যদি আপনারা মনঃসমীক্ষণ সম্পর্কে কোনো আগ্রহ দেখান। তবে শুরু করার পক্ষে এ যথেষ্ঠর চেয়েও বেশি। যদি এসবের হতাশাজনক প্রতিক্রিয়া কাটিয়ে উঠতে পারেন, তাহলেই আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারব।
-সিগমুন্ড ফ্রয়েড।
#মন
#মনঃসমীক্ষণের_ভূমিকা
#স্বপ্ন
#স্বপ্নের_ব্যাখ্যা