রিদ্দা বা দ্বীন ত্যাগঃ কারণ এবং প্রতিকার| কখনও ঝরে যেও না | Revive Your Iman
তারেক মাহান্না কর্তৃক রচিত 'কখনও ঝরে যেও না' বই এর 'রিদ্দা বা দ্বীন ত্যাগঃ কারণ এবং প্রতিকার| কখনও ঝরে যেও না' অধ্যায় থেকে সংগৃহীত।
দ্বীন ত্যাগের মাধ্যমে একজন মানুষ চিরকালের জন্য জাহান্নামের অভিশপ্ত স্থানে ঠাঁই করে নেয়, যদি না সে মৃত্যুর পূর্বে তাওবা করে। দ্বীন ত্যাগ করলে ক্ষতি আর কারো নয়, ক্ষতি তার নিজের। রাসুলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম)–এর সময় এমন মানুষও ছিলো যারা তাঁকে সা. সরাসরি দেখেছে, তাঁর কথা শুনার সৌভাগ্যলাভ করেছে, তাঁর সাথে চলাফেলা করেছে, তাঁর পেছনে সালাত আদায় করেছে, এমনকি এদের মধ্যে কেউ কেউ কুরআন লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পর্যন্ত পালন করেছে–কিন্তু এরপরেও তাদের কেউ কেউ মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল।
সুতরাং এরকম সামান্য কোনো ব্যক্তি ইসলামে থাকলো কী থাকলো না–তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। এতে আমাদের লাভ বা ক্ষতি কিছুই হয় না।
ইসলাম ছেড়ে চলে যাবার কারণগুলো নিয়ে এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা করাটা বেশ কঠিন, কিছু কিছু ব্যাপার ব্যক্তিগতও বটে। কিন্তু আমি এতোটুকু বলবো যে–এক ধরনের শুষ্ক ইসলাম পালন করার ফলে এই পরিণতি ঘটে। এই বিশেষ ধাঁচের ইসলামচর্চায় ইবাদাত আর আত্মশুদ্ধির জন্য সময় থাকে না। মূল মনোযোগ থাকে খবর পড়ায় আর বিতর্কিত বিষয় নিয়ে তর্ক করায়। ফলে, রিদ্দা বা দীনত্যাগ তারই অবশ্যম্ভাবী ফল।
এই ধারার মানুষদের লেখাগুলোতে আবার চোখ বুলিয়ে দেখুন, দেখবেন আমি ঠিকই বলছি।
আমরা অনেক সময় কোন ব্যাক্তির বিপ্লবী কথাবার্তা শুনে তাকে “ভালো দ্বীনি ভাই” ভাবা শুরু করি, তখন এমনটা হতে পারে যেআমরা তার বিদ্রোহী চেতনাকে দ্বীনের প্রতি আন্তরিক উৎসাহ ও নিষ্ঠা বলে ভুল করছি। প্রকৃতপক্ষে এমনটা হতে পারে যে ঐ ব্যক্তির জন্য ইসলাম হল শুধুমাত্র “এই মাসের স্পেশাল অফার”।
এরকম হওয়ার সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো–তার কথাবার্তা ও দ্বীনি পড়াশোনার মাঝে অন্তর কোমলকারী বিষয়সমূহের নগণ্য উপস্থিত। কখনোই নাফল ইবাদাত না করা এবং ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা হিসেবে অনুধাবন করার চেষ্টা না করাও এর অন্তর্ভূক্ত।
এই ধরনের মানুষগুলোকে শুধুমাত্র বিতর্কিত এবং আমোদজনক বিষয়গুলো নিয়ে তর্কে মেতে থাকতে দেখা যায়। কারণ শুধুমাত্র স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজেকে বাকি সবার চাইতে আলাদা প্রমাণ করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই এই মানুষগুলো ইসলামে প্রবেশ করে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিতে নয়।
তারা পুরোন কথা শুনতে আগ্রহ পায় না, সবসময় নতুন কিছুর জন্য অস্থির হয়ে থাকে। শতকরা ৯৯ ক্ষেত্রে এটাই তাদের ইসলামের ব্যাপারে অনাগ্রহী হয়ে উঠার কারণ। এই ধরনের লক্ষণগুলো অন্য যাদেরমধ্যে দেখা যায় তাদেরকে নিয়েও আমার ভয় হয়। খুব বেশী দেরী হয়ে যাবার আগেই নিজে রক্ষা করুন। দ্বীনের মাঝে বিতর্ক আর বিনোদন খোঁজা বন্ধ করুন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সম্পর্কে জানতে, তাঁর সম্পর্কে সচেতন হতে চেষ্টা করুন । চেষ্টা করুন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে নিজের সম্পর্ক গড়ে তুলতে।
কারো কারো কাছে হয়তো এটা একঘেয়ে, বিরক্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটাই আপনাকে রক্ষা করবে। সবসময় বিতর্কিত বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন না, এবং তার বদলে প্রতিদিন চোখ বোলানোর জন্য নিচের বইগুলোকে আপনার টেবিলে স্থান দিন:
– আল কুরআন
– রিয়াদুস সালেহীন, ইমাম নববী
– আল আদাব আলমুফরাদ, আল বুখারী
– আয যুহদ, ইমাম আহমাদ
এই বইগুলো শুধুশুধু লেখা হয়নি। এই সিলেবাসটি নিয়মিত ধরে রাখার চেষ্টা করুন। এগুলো নিয়মিত পড়লে আপনার হৃদয়ের চারপাশে একটি দুর্গ গড়ে উঠবে। যখন ফিতনার আঘাত আসবে তখন এই দুর্গই আপনাকে রক্ষা করবে। এবং নিশ্চিত থাকুন আজ হোক, কাল হোক, ফিতনার এই আঘাত এক সময় আসবেই।
রাসূলুল্লাহ সা. এর একটি হাদীস আছে যা এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রযোজ্য-
ইয়াহইয়া ইবনু আইয়ুব, কুতায়বা ও ইবনু হুজর রহ. আবূ হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন:
“অন্ধকার রাতের মত ফিতনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের প্রতি অগ্রসর হও। সে সময় সকালে একজন মুমিন হলে বিকালে কাফির হয়ে যাবে। বিকালে মুমিন হলে সকালে কাফির হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে বসবে।”
[ ইসলামিক ফাউন্ডেশন| সহীহ মুসলিম | অধ্যায়ঃ ১| কিতাবুল ঈমান | হাদিস নাম্বার: 214 ]
আমরা অত্যন্ত কঠিন এক সময়ে বসবাস করছি। এই সময়ে দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে রাখা জ্বলন্ত কয়লা আঁকড়ে ধরে রাখার মতো–এরকম আরো অনেক কিছুই আমি বলতে পারি, কিন্তু এগুলো আপনারা ইতিমধ্যেই জানেন।
আমাদের মূল সমস্যা হল, আমাদের ঈমান ও দ্বীনকে দৃঢ় করার যে ধীর, ক্লান্তিকর এবং কঠিন পথটি আছে, তা আমরা পাশ কাটিয়ে যেতে চাই। অথচ এই পথটিই আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করবে। আমাদের শক্তিশালী করবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের জন্য যে পরীক্ষা রেখেছেন তাঁর জন্য আমাদের প্রস্তুত করবে ।
ইসলাম প্রকৃত পুরুষদের দীন।এই দ্বীন সংগ্রামের দ্বীন।অধ্যবসায়েরদ্বীন ।ধৈর্যের দ্বীন।এবং পরীক্ষার দ্বীন।
আপনি অবশ্যই পরীক্ষিত হবেন–এবং একজন প্রকৃত পুরুষ মাত্রই ভালো মন্দ সকল অবস্থা নির্বিশেষে আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকতে পারে। আর যারা নামকা ওয়াস্তে আল্লাহর ইবাদাত করে, তারা বিপদের প্রথম আভাস পাওয়া মাত্র চাপের মুখে নতি স্বীকার করে।
এছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, আমাদের কারো কারো মনে আমাদের অজান্তেই এক ধরনের গোপন অহংকার কাজ করে। দৃঢ়, স্থির সংকল্প হবার জন্য আমরা আমাদের নিজেদের ওপরই ভরসা করি এবং ভাবতে শুরু করি আমরা বর্তমানে ‘ইলম, আক্বীদাহ, ঈমানের যে পর্যায়ে উপনীত হয়েছি সেটা সম্ভব হয়েছে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মাধ্যমেই। আমি এরকম অসংখ্য ভাইকে দেখেছি, যে তাঁরা কখনো দ্বীন অথবা সুন্নাহ ছেড়ে দেবেন আমি তা কখনো কল্পনাও করিনি– কিন্তু তাই হয়েছে। এবং এরকম হবার মূলকারণ আমাদের এই ধরনের চিন্তাধারা।