কওমি মাদ্রাসার সরকারি বাজেট থেকে অর্থ নেওয়ার যে দাবি উঠছে, এটা আমার কাছে একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছে।
দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাকালে মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ. উসুলে হাশতগানা নির্ধারণ করেছিলেন। এই আটটি মূলনীতির একটি ছিল এই যে কওমি মাদ্রাসা কখনো রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হবে না, বরং জনগণের স্বেচ্ছা দানের উপর নির্ভর করে চলবে। ১৮৫৭ সালের পর যখন ব্রিটিশ শাসন মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল, তখন আকাবিররা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সচেতনভাবে। সরকারি অনুদান মানেই সরকারি নিয়ন্ত্রণ, এই সত্যটা তারা বুঝেছিলেন সেদিনই। আলিয়া মাদ্রাসার দিকে একটু তাকালেই যেকোনো সচেতন মানুষ এর প্রমাণ পেয়ে যাবেন।
•
রাষ্ট্রের বাজেটের টাকা আসলে কার? এটা দেশের তামাম জনগণের অর্থ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ সবার করের পয়সা মিলিয়ে এই বাজেট তৈরি হয়। সুতরাং এই টাকায় সবার হক থাকে, তাই রাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই এখানে খবরদারি করবে। সরকারি স্কুল এবং আলিয়া মাদ্রাসায় এটা এখনই হচ্ছে। একবার এই দরজা খুলে গেলে কওমির ঐতিহ্য, ধারা ও সিলসিলা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকবে এবং কওমি তার মৌলিক স্বাতন্ত্র্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
•
কওমি মাদ্রাসা এতদিন যেভাবে চলেছে সেটা মূলত একটি স্বেচ্ছামূলক ক্রাউডফান্ডিং ব্যবস্থা। এখানে সবার হক নেই, যারা দান করেন তারা দেন সদকার নিয়তে, বিনিয়োগের হিসেবে নয়। ফলে তারা চাইলেও মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কর্তৃত্ব করার সুযোগ পান না। পক্ষান্তরে সরকার একবার টাকা দিলে পুরো দমে হস্তক্ষেপ করবে। এটাই রাষ্ট্রের স্বভাব, এটাই তার ক্ষমতার যৌক্তিক দাবি।
•
পাকিস্তান ও ভারতে এই একই কাজ করার চেষ্টা হয়েছিল। পাকিস্তানে ২০০১ সালে মুশাররফ সরকার মাদ্রাসা রেজিস্ট্রেশন অর্ডিন্যান্স জারি করে। লক্ষ্য ছিল নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারি অর্থায়ন দিয়ে ধীরে ধীরে পাঠ্যক্রম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। উলামায়ে কেরাম সরাসরি অসহযোগিতা করেন, হাজারো মাদ্রাসা নিবন্ধন প্রত্যাখ্যান করে এবং সরকার শেষপর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
সম্প্রতি NCPCR-এর মাদ্রাসাবিরোধী সুপারিশের বিরুদ্ধে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে। ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট ওই নির্দেশনার ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
আমরা নিজেরাই সেই দরজায় টোকা দিতে চাইছি, যেটা ঠেকাতে আকাবির ওলামায়ে কেরাম কত পরিশ্রম করেছেন।
•
ভারতে আল্লামা আরশাদ মাদানী ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সরকারের কাছে হাত না পেতে কোটি কোটি টাকার সামাজিক কাজ করছেন। হাসপাতাল চালাচ্ছেন, দুর্যোগে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ছেন। আর শুধু তাই নয়, মুসলিমদের পক্ষে আইনি লড়াই লড়ছেন কোটি টাকা খরচ করে। একেকটি মামলায় আইনজীবী নিয়োগেই লেগে যাচ্ছে পনেরো লাখ, বিশ লাখ টাকা। এই টাকা কোথা থেকে আসছে? সরকারি বাজেট থেকে নয়, উম্মাহর কাছ থেকে। আমাদের দেশেও শাইখ আহমাদুল্লাহ সাহেব দেখিয়ে দিচ্ছেন যে স্বনির্ভর থেকেও বড় কাজ সম্ভব। তাহলে আমরা কেন সরকারের দিকে মুখ তুলে বসে আছি?
•
সাধারণ আলেম সমাজের বদৌলতে কওমিয়ানদের বাজেট থেকে হিস্যা চাওয়ার এই প্রবণতা সত্যিই ভয়ংকর। আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন।
ওয়ালী উল্লাহ মাশরুফ
১৮-৬-২০২৬