গত কয়েকদিন আগে ফ্রান্সের ঘটনায় 'ফ্রীডম অফ স্পীচ' ইস্যুতে লিখেছিলাম, "লিবারেলিজম যে সত্য তা প্রমাণ করুন", তারপর 'ফ্রীডম অফ স্পীচকে' সংজ্ঞায়ন করুন, তারপর আমরা মেনে নেবো। কিন্তু মনে হলো- আমার কথাগুলো খুব সংক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। আরেকটু ইলাবোরেট করা দরকার, বুঝিয়ে বলা দরকার।
এক ভারতীয় স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান অভিষেক উপমন্নু তার এক ভিডিওতে কমেডির ছলে কিছু কথা বলেছিলেন। তিনি তার বাবাকে বলছিলেন, "বাবা, বড়োদের কেন সম্মান করতে হয়?" বাবা অনেকক্ষণ ভাবলেন, তারপর বললেন, "উম.. এমনিই করতে হয়" ছেলে আবার বললো, "এমনি কেন? কোনো কারণ তো থাকা চাই!" তখন বাবা বললেন, "কারণ, আমরা আগে জন্মেছি.." ছেলে বললো, "তো? আর?" এরপর বাবা বললেন, "আর তো কিছু জানিনা!" ছেলে বললো, "যদি না করি?" তখন বাবা আর কিছু খুঁজে না পেয়ে বললেন, "তাহলে দাঁতে পোকা ধরবে...!"
এই ঘটনাটি কেন আনলাম একটু পরেই বুঝিয়ে বলছি। তার আগে একটা ব্যাপার ভেবে দেখুন। আমরা নিত্যদিনে চলার পথে কী কী কাজকে বৈধ মনে করি, কী কী কাজকে অবৈধ মনে করি? আমরা সত্য কথা বলাকে বৈধ, মিথ্যা বলাকে অবৈধ মনে করি। চুরি করাকে খারাপ মনে করি। কাউকে অন্যায়ভাবে আঘাত করাকে খারাপ মনে করি। এইযে কিছু বৈধ-অবৈধ ধারণা বা ভালো-খারাপ ধারণা, এগুলো কোথা থেকে এলো? কারা ঠিক করে দিলো? এই নৈতিক অবস্থানগুলোর মানদণ্ড কী?
যারা ধর্মে বিশ্বাসী, তাদের ক্ষেত্রে উত্তরটা খুব সহজ। আমরা ধর্মগ্রন্থ থেকে এই নৈতিক অবস্থানগুলো গ্রহণ করি। মুসলিম ন্যারেটিভেই বলি। কুরআন এবং সুন্নাহতে যেসব কাজকে নৈতিক বলা হয়েছে, সেগুলোকে আমরা নৈতিক বলি- যেগুলোকে অনৈতিক বলা হয়েছে- সেগুলোকে অনৈতিক বলি। এটা হচ্ছে অবজেক্টিভ মোরালিটি, এটা অপরিবর্তনীয়।
এখন এই নৈতিক অবস্থানগুলোকে আমরা যেহেতু অবজেক্টিভ বলছি, সেহেতু আমাদের বিশ্বাসে এগুলো বাইনারী হওয়া বাঞ্চনীয়। সেটা কেমন? পুরো পৃথিবীর সাপেক্ষে এই নৈতিক অবস্থানগুলোকেই আমরা সত্য বলে বিশ্বাস করি, এর বাইরের সব নৈতিক অবস্থানকে আমরা মিথ্যা বলে বিশ্বাস করি। উদাহরণস্বরূপ, ইসলাম বলে চুরি করা অবৈধ এবং অনৈতিক। কেউ যদি এসে বলে চুরি করা বৈধ, আমরা সেটা মানবো না। এই নৈতিক অবস্থান আমাদের নৈতিক অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু সে যদি আমাদেরকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, কেন আমাদের নৈতিক অবস্থানটি সঠিক? কেন এই অবস্থানটি সত্য? 'চুরি করা খারাপ' এই স্টেটমেন্টটা সত্য এটা আমরা কীভাবে প্রমাণ করতে পারি?
এর উত্তরটাও সহজ। আমরা ক্লেইম করি, ইসলাম এই পৃথিবীর স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কতৃক মনোনীত ধর্ম। তিনি এই কুরআন পাঠিয়েছেন৷ অসংখ্য নবী-রাসুলের পর মুহাম্মদ (স) কে শেষ নবী করে পাঠিয়েছেন। তাই কুরআন এবং মুহাম্মাদ (স) এর সুন্নাহই নৈতিকতার একমাত্র মানদণ্ড এবং সত্য। কেননা তা স্রষ্টার পক্ষ থেকে। আর স্রষ্টাই মানুষের ভালো-মন্দ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান রাখেন। তাই তিনি যা ভালো হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তা ভালো। তিনি যা খারাপ বলে চিহ্নিত করেছেন, তা খারাপ। ১+১=২ এটা যেমন সত্য, স্রষ্টার নির্ধারিত নৈতিকতাও আমাদের কাছে সত্য।
কিন্তু..
স্রষ্টার নির্ধারণের বাইরে কি নৈতিকতা থাকতে পারে? মানুষ কি ভালো-মন্দ নির্ধারণ করতে পারে? যদি সত্যিই পেরে থাকে, তবে সেই নির্ধারণের মানদণ্ড কি? সবাই কি একইরকম করে চিন্তা করে? সবার কাছে কি একই জিনিস নৈতিক কিংবা অনৈতিক? কারো কাছে চুরি করা অপরাধ, কেউবা আবার দারিদ্রের দোহাই দিয়ে চুরিকে বৈধ মনে করে। তাহলে? কার মতামত গ্রহণ করা হবে? কীভাবে হবে নৈতিক-অনৈতিক নির্ণয়? এখান থেকেই আসে সাব্জেক্টিভ মোরালিটির ধারণা। যেই ধারণা বলে ধ্রুবভাবে নৈতিক কিংবা অনৈতিক বলে কিছু নেই। নৈতিকতা স্থান-কাল-পাত্রভেদে বদলাতে পারে, এটাই তাদের ভাষ্য। তবে আমার আজকের আলোচনা এদের নিয়ে নয়।
আমাদের আজকের আলোচনা এমনকিছু মানুষ নিয়ে যারা নিজেরাই নিজেদের নৈতিকতা তৈরি করেছে। ইতিহাস তাদেরকে লিবারেল নামে চেনে। এদের মধ্যে আসে জন লক, এমানুয়েল কান্ট, জেরেমি ব্যান্থাম, জন স্টুয়ার্ট মিল এবং জন রলসদের নাম। এরাই বিভিন্ন ধাপে লিবারেলিজম নামক তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এদের অধিকাংশই হচ্ছেন স্রষ্টায় অবিশ্বাসী। কিন্তু তারপরও তারা নৈতিকতা পরিমাপের কিছু ভিত্তি তৈরি করে গেছেন।
আর তাদের প্রধান আলোচনা ছিলো 'ব্যক্তিস্বার্থ' কেন্দ্রিক। তারা বিশেষভাবে ব্যক্তির সুখ, ব্যক্তির স্বাধীনতা এসব নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। কেউ হিডেনিস্টিক (hedonistic) প্রিন্সিপাল ব্যবহার করেছেন (ব্যক্তি যেটায় সুখ পায়, সেটাই নৈতিক। যেটায় দুঃখ পায়, সেটা অনৈতিক), কেউ ব্যবহার করেছেন ইউটিলিটারিয়ান (utilitatian) প্রিন্সিপাল (সুখের সর্বোচ্চকরণ, ব্যাথার সর্বনিম্নকরণ। সামষ্টিক অর্থে), কেউ সাথে জুড়ে দিয়েছেন হার্ম (harm) প্রিন্সিপাল (যতক্ষণ না অন্য কারো ক্ষতি হচ্ছে, ততক্ষণ যা ইচ্ছা করো)।