লেখিকা ফারজানা মাহবুবা কে আমার বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দিয়েছি আজ।
আমি উনাকে চিনতাম না, ফেসবুকে কিছু বিতর্কের সুবাদে উনার সম্পর্কে জানতে পারি। চিন্তার দূরত্ব যতোই হোক, যারা পড়াশোনা করেন বা লেখালেখি করেন তাদের নিয়ে আমার কৌতূহল থাকে। বিশেষত ফা.মা'র লেখালেখির পরিসর যেহেতু ইসলাম ও জেন্ডার তাই তার লেখালেখি নিয়েও আগ্রহ ছিল। ঘটনাচক্রে দেখি উনি আমার মত একজন অগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে উনি ফ্রেন্ড-রিকোয়েস্ট পাঠালেন, আমিও এক্সেপ্ট করি। আমি খুব আগ্রহ ভরেই উনাকে ফলো করে আসছিলাম। কিন্তু সময় যতো যাচ্ছিল উনার চিন্তাভাবনা ততোই প্রব্লেমেটিক মনে হতে লাগলো। মাঝেমধ্যে উনার পোস্টে মন্তব্য করে বাদানুবাদ হয়েছে, কিন্তু সম্প্রতি তার পোস্টগুলিতে ভিষণ বিরক্তির উদ্রেকের ফলস্বরূপ আনফ্রেন্ডিং অপশন বেছে নিলাম।
আমার মত ট্র্যাডিশনাল কোন দেওবন্দি ডিসাইপল ফা.মা'কে অপছন্দ করার ব্যাপারটিকে 'হুজুরদের গতানুগতিক সংকীর্ণতা ও পুরুষতান্ত্রিক মোল্লাতন্ত্র' বলে ডিসমিস করা খুব সহজ।
কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তেমন কিছু না। আমি আসলে সিরিয়াসলি এন্টি-মডার্ন, মডার্নিটির এন্টায়ার ফিলসফিকার প্রজেক্টের বিরোধী, মোল্লাতান্ত্রিক ভাবে নয়, বরং দর্শন তাত্ত্বিক ভাবে।
আমাদের কালচারে নারীর প্রতি বৈষম্যের যেসব কাঠামোগত উপাদান রয়েছে সেগুলোকে রিকগনাইজ করি এবং সেগুলো নিয়ে আন্তরিক মর্মবেদনা উপলব্ধি করি।
কিন্তু এই সমস্যাগুলোর উত্তরণ নিয়ে বা সমস্যার সংজ্ঞায়ন ও নির্ধারণ নিয়ে মডার্নিটি যে প্যারাডাইম নিয়ে হাজির হয়েছে সেগুলোর ঘোর সমালোচক। খুব সহজ করে বলতে গেলে কোনটি সমস্যা, আর কোনটি 'পার্ট অব কসমিক প্লান', বা কোনটি 'প্যাট্রিয়ার্কি' আর কোনটি প্রকৃতির আরোপন..এই সওয়ালগুলোর জওয়াব নিয়েই তর্কটা। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভুলুশনের পর সমাজের উপাদানগুলো কিভাবে ভেঙে কিভাবে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের জন্ম হয়েছে, কিভাবে ব্যক্তি ও তার অভিলাষগুলো কালেক্টিভ বোধ ও মূল্যবোধের উপর চড়াও হয়েছে, কিভাবে 'মডার্ন সেল্ফ' নতুন বিনির্মিত পৃথিবীতে নিজের এজেন্সিকে ক্লেইম করেছে, কিভাবে মডার্ন মানুষ জীবনের মাকসাদকে নিজের অজান্তেই রিডিফাইন করেছে, নতুন ওয়ার্ল্ডভিউর কাছে কিভাবে নিজের রুহানি সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়েছে সেসব নিয়েই আমার বাদ-বিবাদ।
এই সবগুলো সওয়ালের মীমাংসা কখনো নৈর্ব্যক্তিক হয়না, এখানেই চিন্তার প্যারাডাইম এসে হাজির হয়। ইসলামের সাথে মডার্নিটির এই ক্রাইসিসের জেনেসিস এখান থেকেই। মডার্নিটি যতগুলো স্তম্ভের উপর দাড়িয়ে নিজেকে হাজির করে, তার সবগুলো ইসলাম গভীরভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ঠিক এ কারণেই মডার্নিটির সাথে গোটা দুনিয়ার ফয়সালা হয়ে গেলেও ইসলামের হবে না, এটা সম্ভবও না। মুসলমানদের সাথে মডার্ন ওয়ার্লের বোঝাপড়া হইতে পারে, প্র্যাগম্যাটিক এডাপটেশন ও হতে পারে, কিন্তু মডার্নিটির সাথে কোন আপোষ কখনোই হবে না।
এই সত্যটা পশ্চিম বুঝলেও ওয়ান্নাবি ব্রাউন স্লেইভরা হয়তো বুঝে না। এই ক্রাইসিসের গর্ভেই একটা হীনমন্য লস্ট-জেনারেশন জন্ম নিয়েছে যারা মডার্নিটির কোলে বসে নিজের বিশ্বাককে এসার্ট করতে চায়। এরা অসৎ নয়, তবে দার্শনিক বিচারে এরা জাহেল। ফারজানা মাহবুবা কে আমার সেই লস্ট/কনফিউজড আইডেন্টিটির একজন প্যাথেটিক সৌল মনে হয়।
সমস্যাটা আসলে প্যারাডাইমের। এই প্যারাডাইমের চোরাবালিতে আটকে গেলে আপনার হীনমন্য সত্ত্বা কখনো আর বের হতে পারবে না। এরপর আপনি ইসলাম যে প্যাট্রিয়ার্কাল নয় তার প্রমাণের জন্য কখনো 'আর্রিজালু কাউয়্যামুনা'র সবচেয়ে উদ্ভট ব্যাখ্যাটা হাজির করবেন, কখনো প্যাট্রিয়ার্কাল ব্যাখ্যা দেয়ার অভিযোগে হাজার বছরের ইলমি ট্র্যাডিশনকে ডিনাই করবেন, কখনো ইমাম গাজালিকে নারীবিদ্বেষী বানিয়ে ফিকহ রিফর্মের দাবি তুলবেন..... ব্লা ব্লা!
ইজতিহাদের সব বন্ধ হয়ে গেছে এমন আলাপ তুলেছি না, কিন্তু আপনার এই প্রয়োজনের অনুভব যে একটি ফিলসফিকাল ইগ্নোরেন্স হতে উদ্ভূত তা হয়তো নিজেও কখনো উপলব্ধি করবে না।
সোশ্যাল সাইন্সের সবগুলো আলাপই এমন কিছু 'সীকার্য'এর উপর বিনির্মান করা হয় যা একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ল্ড ভিউর উপরেই দাড়ায়, ওইটার গোড়ায় একবার কুঠারাঘাত করবেন, তারপর দেখবেন যে জ্ঞানের নামে কত অসংখ্য গার্বেজকে একাডেমিক রূপ প্রদান করা হয়েছে।
বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ফারজানা মাহবুবা হয়তো আলোচ্য সূচিতে থাকাই ডিজার্ভ করে না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার জামানায় সালমান মুক্তাদিররাও নোয়াম চমস্কির চাইতে বেশি ফলোয়ার পায় এই রিয়ালিটি মাথায় রেখে কল-আউট করতে হয় কখনো কখনো।
কারও প্রতি আমার কোন ব্যক্তিগত আক্রোশ বিদ্বেষ কিছু নেই। কিন্তু ওয়েস্টার্ন একাডেমিয়র জার্নাল আর্টিকেল বেইজ্ড ইল্ম চর্চার জামানায় কত অসংখ্য প্রিটেনশাস স্কলারের জন্ম হবে সে সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।
নাইম হাসান
26/10/2022