ইসলামের চির দুশমন আবু জাহিলের পেটে যে দুই কিশোর ছুড়ি ঢুকিয়েছিলেন তাঁরা বর্তমানের দৃষ্টিতে যুবক ছিলেন না। শিশুই বলা চলে। অথচ তাঁরা ইতিহাসের পাতায় মহানায়ক।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস, আব্দুল্লাহ বিন উমর, উসামা বিন যায়দরা (রাদিআল্লাহু আনহুম) যে বয়সে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছিলেন সেই বয়সের ছেলেরা এখন একাএকা কোথাও যায় না ছোট বলে। বাবা-মায়েরাও চোখেচোখে রাখেন বাচ্চা মানুষ বলে।
মক্কা বিজয়ের পর মক্কার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন ইতাব বিন উসায়দ। সেসময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। অথচ এখনকার ২১ বছর বয়সীরা দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বেড়ালেও ঠিক ফজরের সময় তড়িঘড়ি করে উঠে প্রিয় দলের খেলা দেখতে টিভির সামনে বসে।
মক্কা বিজয়ের পর মসজিদুল হারামের মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন আবু মাহজুরা রাদিআল্লাহু আনহু। এই দায়িত্ব যখন নবী ﷺ তাঁর ওপর অর্পণ করেছিলেন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ষোলো বছর। বর্তমানে ষোলো বছরের ছেলেপেলে মসজিদে গিয়ে আজান দেবে তো দূরের কথা, মসজিদ দেখেই পালিয়ে বেড়ায়। বাবার কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়ে বানায় কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা।
উহুদ যুদ্ধে কম বয়সের কারণে যায়দ বিন সাবেত রা.-কে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৩-১৪ বছর। কিন্তু তাঁর মেধার গভীরতায় মুগ্ধ হয়ে নবী ﷺ তাঁকে ওহী লেখক এবং ভিনদেশী ভাষা (হিব্রু ও সুরিয়ানি) শেখার দায়িত্ব দেন, যা তিনি মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আয়ত্ত করেছিলেন। আজকের কিশোররা যেখানে সস্তা বিনোদনে মগ্ন, প্রিয় টিমের সাপোর্টে মিছিল করতে ব্যস্ত, সেখানে তিনি ছিলেন ইসলামের অফিসিয়াল অনুবাদক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পাহারাদার।
রাসূল ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণী করা সেই বিখ্যাত রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) জয় করেছিলেন সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহ মাত্র ২১ বছর বয়সে। যে অপরাজেয় দেয়াল শত শত বছর ধরে কেউ ভাঙতে পারেনি, তা একজন ২১ বছরের যুবকের রণকৌশল ও ঈমানের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। আর আমাদের ২১ বয়সী ভাই হাস্যরসের রিলস বানাতে কী কসরত করছে!
স্পেনের মাটিতে পা রেখেই সেনাপতি তারেক বিন যিয়াদ সৈন্যদেরকে বলেছিলেন, "পেছনে সমুদ্র, সামনে শত্রু—যাও লড়াই করো।" তাঁর এই অদম্য সাহসী সিদ্ধান্ত গোটা ইউরোপের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। আর আমরা বদলে দিব তো দূর কি বাত, নিজেরাই বদলে যাচ্ছি।
সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, তার সেনাপতি ছিলেন মাত্র ১৭ বছরের এক তরুণ—মুহাম্মদ বিন কাসিম। বর্তমানের ১৭ বছরের একটা ছেলে যেখানে ক্যারিয়ার বা গেমসের নেশায় বুঁদ, সেখানে তিনি একটি গোটা সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ইতিহাসের এই ফিরিস্তি অনেক লম্বা। দুঃখের বিষয় হল আমাদের ইতিহাসের সাথে নিজেদের কাজের কোনো মিল নেই। ব্যর্থতা, অযোগ্যতা, আত্মতুষ্টি এবং স্বার্থপরতার জালে আমরা বন্দী। আমাদের সুখের সংজ্ঞা এখন পরিবর্তিত। জয়-পরাজয়ের ধারণাও এখন পাল্টে গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে যেটা বিজয় সেটাই এখন আমাদের বিবেচনায় উগ্রতা।
আমরা যদি আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারতাম এবং সেভাবে না হোক, অন্তত আমাদের পূর্বসূরিদের ৫০% চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে পারতাম তাহলে অন্তত প্রতিটি এলাকায় একটা মডেল মসজিদ এবং উন্নত মানের মাদ্রাসা পরিচালনা করা আমাদের দ্বারা অবশ্যই সম্ভব হত। অথচ বর্তমানে কতো বাধা! কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকারও যেন শক্তি নেই আমাদের।
হে যুবকদল! কী জবাব দেবেন আল্লাহর দরবারে? এই বয়সের হিসাব কিন্তু আল্লাহ নেবেনই। পুরো জীবনের হিসাবের পাশাপাশি আল্লাহ আলাদা করে যৌবনকালের হিসাব নেবেন। সুতরাং আল্লাহ যে কাজের জন্য এই উদ্যম-শক্তি আপনাকে দিয়েছেন সেই কাজে ব্যয় না করলে অবশ্যই অবশ্যই কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবেনই হবেন।
আর কতো নির্ভার এবং নিশ্চিন্ত থাকব আমরা? আমরা না জাগলে কে জাগাবে এই জনপদের মানুষদেরক?
জাগুন। পরামর্শ নিয়ে আসুন। মানবপ্রাচীর নির্মাণ করুন। হাতে হাত রেখে সুন্দর এবং সুখময় সমাজ গঠনে আত্মনিয়োগ করুন। আপনারা জাগলে বাতিলের চোখ নষ্ট হবেই।
যৌবনের এই উত্তাল জোয়ারকে যারা আল্লাহর দেওয়া আমানত মনে না করে কেবল ভোগ-বিলাসে উড়িয়ে দিচ্ছে, তারা আসলে এক চরম মরীচিকার পেছনে ছুটছে।
হে যুবক, ইতিহাস আমাদের দিকে তাকিয়ে ফরিয়াদ করছে! যে বয়সে আলী (রা.) রাসুল ﷺ-এর বিছানায় নিজের জীবন বাজি রেখে শুয়েছিলেন, মুসআব বিন উমাইর (রা.) মদিনার ঘরে ঘরে ইসলামের আলো পৌঁছে দিয়েছিলেন—সেই বয়সটা কি আপনি শুধু স্ক্রিন স্ক্রল করে, খেলায় মত্ত হয়ে, আর বন্ধুদের পেছনে অন্ধের মতো ছুটে পার করে দেবেন? জেগে উঠুন, কারণ আপনার জাগরণের ওপরই নির্ভর করছে এই উম্মাহর আগামী দিনের সকাল!
জাগুন, দায়িত্ব নিন, উম্মাহকে মুক্ত করুন।
© সংগৃহীত