১। কাদিয়ানিরা ইসলামী শরীয়াহর অনেক, অনেকগুলো দিক মানে। তবু অল্প কয়েকটা মৌলিক আকীদাহগত বিকৃতির কারণে আহলুসসুন্নাহ তাদেরকে মুসলিম হিসেবে স্বীকার করে না। লালন এবং তার অনুসারীদের অবস্থানের সাথে ইসলামী শরীয়াহ এবং মৌলিক আকীদাহর মিল কম, অমিল অনেক বেশি। লালনবাদীরা কিভাবে আশা করে আহলুসসুন্নাহ তাদের বাতিল ফিরকা হিসেবেও স্বীকার করবে? ইসলাম আর মুসলিম পরিচয় নিয়ে আলোচনায় তাদের কোন ধরণের প্রাসঙ্গিকতা থাকবে?
.
২। কিছু মানুষ লালনকে ব্যবহার করে এক ধরণের 'লোকায়ত ফোক ইসলাম' বা 'ফোক মুসলিম' পরিচয় তৈরি করতে চায়। এমন ইসলাম যেটা সাংস্কৃতিকভাবে কিছু ইসলামী উপদান ধারণ করবে, কিন্তু সামাজিক ও শাসনগত দিক থেকে সেক্যুলার হবে। এমন 'মুসলিম' যে শাহবাগী বা বুড়ো হয়ে দাদা বনে যাওয়া প্রজন্মের সেক্যুলারদের মতো সরাসরি ইসলামবিদ্বেষী হবে না, নিজেকে মুসলিম বলবে। কিন্তু মৌলিকভাবে সেক্যুলারই থাকবে।
.
এই ধরনের কিছু তৈরি করা কেন জরুরী? কারণ আদর্শিকভাবে বাংলাদেশের সেক্যুলারদের (বাম ও ডান) সামনে সবচেয়ে বড়, দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হল ইসলামপন্থা, যারা বোঝার তারা এটুকু বোঝে। এই স্রোতকে ঠেকানো বা নিজেদের কাজে লাগানোর জন্য এই ধরণের ফোক ইসলাম বা কালচারাল মুসলিম পরিচয় তৈরি জরুরী।
.
একারণেই লালন নিয়ে আলাপে বারবার 'ইসলামের স্থানীয় রূপ', 'আরব, ইরান, আফগানের ইসলাম আমদানী করা ঠিক না' - এই ধরণের কথাবার্তা চলে আসে। যারা ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের জায়গা থেকে লালনের মুসলিমকরণের বিরোধীতা করে, তাদেরকে নানা ট্যাগ লাগিয়ে নাকচ করার চেষ্টা করা হয়।
.
৩। বাংলাদেশে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাবীন্দ্রিক বাঙ্গালিয়ানার সময় শেষ। সমাজ ও শাসনের সেক্যুলার কাঠামো ধরে রাখতে হলে, মূমুর্ষু রাবীন্দ্রিক বাঙ্গালিয়ানাকে বিকল্প কোন সেক্যুলার আইডেন্টিটি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা জরুরী। এমন একটা ছাঁচ দরকার যা আগেরটার মতো উগ্রভাবে ইসলামবিদ্বেষী হবে না, কলকাতার অন্ধ অনুসারী হবে না, আবার সাংস্কৃতিক ও আদর্শিকভাবে ইসলামপন্থার বিরোধিতার সক্ষমতাও যার থাকবে।
.
এই ধরণের বিকল্প খুজতে গেলে লালন একটা অভিয়াস চয়েস। 'ইসলামের স্থানীয় রূপ' আর বিকল্প সেক্যুলার আইডেন্টিটি - দুই ক্ষেত্রেই লালন কার্যকরী। কারণ লালনের অনুসারীদের অবস্থান একধরনের উপমহাদেশীয় মিস্টিসিসম আর সিনক্রেটিসমের (সমন্বয়বাদের) মিশেল। "সব ধর্মেই আছে, আবার কোন ধর্মেই নাই - মন্দির আছে, মসজিদেও আছে - পবিত্রতায় আছে পতিতার মাঝেও আছে" - বিশ্বাসগত দিক থেকে এই ধরণের স্যুডো ইন্টেলেকচুয়াল ভাসাভাসা কথাবার্তা, যেগুলো আধুনিক মানুষ 'স্পিরিচুয়ালিটি' মনে করে। এধরণের বুদবুদ জাতীয় কথাবার্তা ফেনিয়ে ফেনিয়ে যেকোন দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। ইচ্ছেমতো যেকোন কাঠামো দেয়া যায়।
.
কারো একটু বুদ্ধি আর পড়াশুনা থাকলে- লালনের সাথে রেনে গুয়েনন আর জুলিয়াস ইভোলার ট্র্যাডিশানালিসম, ব্লাভাটস্কির থিওসফি, আর দেওয়ানবাগী টাইপের সুফিবাদ মিলিয়েও খুব ইন্ট্রেস্টিং এবং আকর্ষনীয় বিভিন্ন মিক্সচার বানানো সম্ভব।
.
সব কারিকুরির পর শেষ কথা হল, কিছু লোকের লালনপন্থা-র অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ইসলামপন্থার বিপরীতে একটা কার্যকরী সেক্যুলার বাংলা আইডেন্টিটি এবং পথ তৈরি করা। কারণ বাঙ্গালিয়ানার আগেকার মডেল এখন আর সাস্টেইনেবল না।
আসিফ আদনান
25/10/2022