মানুষ ঘুমন্ত, মৃত্যুতে সে জেগে ওঠে...
.
এক অর্থে, আমাদের পুরো জীবনটাই বিক্ষিপ্ততা আর বিস্মৃতির নানা উপকরণের মিশেল। পৃথিবীর জীবন মানুষকে তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য আর চূড়ান্ত গন্তব্য ভুলিয়ে রাখে।
.
এই জীবনের পরে যে আরেকটা জীবন আছে, যেখানে আমাদের সত্যিকারের আবাসস্থল আর সেই চিরস্থায়ী জীবনের খোরাকি সংগ্রহ করাই যে পৃথিবীতে আমাদের কাজ—দুনিয়া আমাদের এ সত্যগুলো ভুলিয়ে রাখে। পার্থিব জীবন আমাদের সামনে আসে বিক্ষিপ্ততা, বিস্মৃতি আর ভোগের ডালি সাজিয়ে। আখিরাতের চিরন্তন জীবনকে মানুষ ভুলে থাকে নশ্বর পৃথিবীর সাময়িক আনন্দ আর তুচ্ছ সব ভোগের জন্যে।
.
নবী (ﷺ) বলেছেন, পৃথিবীতে মুসাফিরের মতো থাকতে। আমাদের অবস্থা হয়েছে সেই মুসাফিরের মতো, গন্তব্যকে ভুলে সফরকেই যে উদ্দেশ্য মনে করে বসে আছে। তার সব মনোযোগ সফর নিয়ে, সব আয়োজন যাত্রাকে উপভোগ করার জন্যে।
.
মানুষকে ভুলিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপকরণগুলোর একটা হলো প্রেম। প্রেমের ব্যাপারে এই সমাজ ও সভ্যতার মনোভাব ইতিবাচক বললে কম বলা হবে। প্রেমকে রীতিমতো মহিমান্বিত করা হয়। একদম ছোটবেলা থেকেই আমাদের মাথায় গেঁথে যায়- প্রেম ছাড়া জীবন আসলে জীবনই না।
.
সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, মিডিয়া সবকিছু মিলে প্রেমের ব্যাপারে এক প্রচণ্ড রকমের মাদকতাময় মিথ গড়ে তোলে। আমাদের সামষ্টিক কল্পনায় তৈরি হয় মানব ও মানবীর মধ্যকার অদম্য আকর্ষণকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা বিস্ময় জাগানো এক জগৎ। যেখানে আছে পারস্য গালিচা, রঙিন পর্দা, চোখ ধাঁধানো ঝাড়বাতি আর নিটোল মুক্তো-প্রবাল দিয়ে সাজানো ভালোবাসার সুরম্য প্রাসাদ।
.
যেখানে প্রত্যেক ক্লান্ত প্রাণের জন্য অপেক্ষা করে থাকে কোনো না কোনো নিখুঁত মানবী। যেখানে পুরুষ মাত্রই নিজ নিজ গল্পের রাজপুত্র, নারী মাত্রই রাজকন্যা। এই কল্পরাজ্যে আজ আমরা সবাই ঢুকে গেছি। অথবা বলা যায়, মাথার ভেতর এই কল্পরাজ্যের টুকরো নিয়ে ঘুরছি আমরা সবাই।
.
কোন এক সামষ্টিক স্বপ্নের মতো।
.
কিন্তু কল্পরাজ্যের অস্তিত্ব কল্পনাতেই। বাস্তবতা ভিন্ন। গত একশো বছরে প্রেম আর নরনারী সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক ও সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ১৯০০ সালে, অ্যামেরিকায় ১৯ বছর বয়সের আগে বিবাহ-পূর্ব যৌন সম্পর্কের অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ৬% নারীর। ১৯৬৮ সাল নাগাদ এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪০%-এ। ২০১৪ সালে ৭৫%।
.
তথ্যগুলো অ্যামেরিকার। তবে আমাদের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিকতা, প্রগতি আর উন্নতির নামে আমরা তো তাদেরই অনুসরণ করছি। তারা যে পথে হেঁটে গেছে, সে পথেই তো আমরা হাটছি কিছুটা দূর থেকে।
.
এই পরিবর্তনের ফলাফল কী? সমাজ ও সভ্যতায় আমরা কী দেখছি আজ?
.
হতাশা, বিচ্ছেদ, বিকৃতি, অবক্ষয়, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, পরকীয়া, পরিবারের ভাঙন, মা-বাবা ছাড়া বেড়ে ওঠা ক্রুদ্ধ প্রজন্ম, কোটি কোটি গর্ভপাত, ‘উন্নত’ বিশ্বে আশঙ্কাজনকভাবে কমতে থাকা জন্মহার, যৌন বিকৃতি, যৌন রোগ, নৈরাশ্যবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা, বিচ্ছিন্নতা, ভেঙে পড়া সমাজ...আধুনিকতা আর প্রগতির তৈরি অসুখের তালিকা অনেক লম্বা। আমাদের সেই সামষ্টিক কল্পরাজ্যের পরিণতি হল আজকের এই দুঃস্বপ্ন।
.
নারী ও পুরুষের মধ্যকার অদম্য আকর্ষণ অস্বীকার করা বা চাপা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু একে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং পরিবার কাঠামো মানুষের সহজাত তাড়নাকে এমনভাবে চালিত করে যাতে তা ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতার জন্য কল্যাণকর হয়। আত্মকেন্দ্রিক সুখের বদলে সামগ্রিক কল্যাণ অর্জিত হয়।
.
কিন্তু আধুনিকতা এই কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা আর প্রগতির নামে যৌনতা এবং/অথবা প্রেমকে বিচ্ছিন্ন করেছে পরিবার, বিয়ে, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা থেকে। চূড়ান্ত মাপকাঠি বানিয়েছে ব্যক্তির সুখ, উপযোগ আর সম্মতিকে। এর অনিবার্য প্রভাব পড়েছে সমাজ, পরিবার এবং সভ্যতায়। তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে সভ্যতার জীবনীশক্তি। মাঝসাগরে আলগা হয়ে গেছে অতিকায় জাহাজের গাঁথুনি। কিন্তু বেখবর যাত্রীরা এখনো আত্মকেন্দ্রিক উল্লাসে মত্ত...
.
একজন মানুষ মাদক ব্যবহার করলে সেটাকে হয়তো তার ব্যক্তিগত সমস্যা বলা যেতে পারে। কিন্ত সমাজ ও সভ্যতা যদি মাদকাসক্তিকে মহিমান্বিত করে, সাফল্যের মাপকাঠি, জীবনের আবশ্যকীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে প্রচণ্ড আকর্ষণীয় করে একে তুলে ধরে এবং মাদককে সহজলভ্য করে দেয়, এবং কোটি কোটি মানুষ সেই মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে–তাহলে সমাজের চিন্তার অক্ষকে বদলে দেওয়া ছাড়া, কেবল ব্যক্তির উপর মনোযোগ দিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করা যায় না।
.
সবকিছু যেভাবে চলছে, সেভাবেই যদি চলে তাহলে পশ্চিমকে গ্রাস করা অন্ধকার, যার ছায়া এরই মধ্যে এ মাটিতেও দীর্ঘ হয়ে গেছে—একদিন আমাদেরও পুরোপুরিভাবে গ্রাস করে নেবে। এ পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে প্রেম, ভালোবাসা, নর ও নারীর সম্পর্ক নিয়ে সমাজ ও সভ্যতার শেখানো চিন্তার ধরনটা বদলে ফেলতে হবে। বের হয়ে আসতে হবে কল্পরাজ্য থেকে। কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষাকে মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করে, নিজেদের চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ ও আইনকে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশনার সমান্তরালে আনতে হবে। তা না